ছবি: সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলায় চেলা নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী থেকে বালু উত্তোলন চললেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। উল্টো পরিবেশ অধিদপ্তরের করা মামলায় স্থানীয় শিক্ষক, দিনমজুর ও নদী রক্ষার আন্দোলনকারীদের আসামি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হচ্ছে।
জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে গত ৬ অক্টোবর দোয়ারাবাজার থানায় একটি মামলা করেন সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাইমিনুল হক। মামলায় ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে ৫ অক্টোবর সোনাপুর এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
স্থানীয়দের দাবি, মামলায় প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার আওয়ামী লীগ কর্মী সৈকত আলী, মোহাম্মদ আলী ও সুজন মিয়া এবং দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা হাজি স্বপন মিয়া, ফয়েজ উদ্দিন ও বিএনপিকর্মী আব্দুর রউফ ও ছেনু মিয়ার নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী চক্র বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মামলার আসামি সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা, স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক ও ফার্মেসি ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শিক্ষকতার পাশাপাশি সামান্য ফার্মেসি ব্যবসা পরিচালনা করি। বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমার বা পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও আমাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে।’
শুধু আসামি নয়, মামলার সাক্ষীদের নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দক্ষিণ সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা ছামির আলী জানান, মামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। আরেক সাক্ষী পূর্ব সোনাপুর হুসাইনিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহতামিম মো. আবু তাহের বলেন, তাঁর অজান্তেই তাঁকে মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজারের ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুফি আলম সুহেল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে ওই অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর দাবি, কেবল সাধারণ শ্রমিকদের গ্রেপ্তার বা মামলা দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা অর্থায়নকারী, নিয়ন্ত্রক ও বিপণনকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নদী থেকে উত্তোলিত বালুর ডাম্পিং পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মজুত বালু জব্দ করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মামলার আসামি ও ছাত্রদল নেতা মাহবুবুল হক শামীম নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি বরাবরই অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন। অথচ তাঁকেই মামলায় জড়ানো হয়েছে।
এদিকে, যাঁদের বিরুদ্ধে বালু উত্তোলনের মূল হোতা হিসেবে অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নির্দোষ ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাইমিনুল হক বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলাটি করা হয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে এজাহারের বাইরে থাকা অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
চেলা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ এবং মামলায় নির্দোষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি- দুই বিষয়েই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।