প্রকাশিত : ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:১৯ (মঙ্গলবার)
শেষ ফোনেও মৃত্যুদণ্ডের কথা বলেননি সুইটি, পরিবার খবর পেল ফেসবুকে

সুইটি আক্তার।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নারী সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে কারাগারে থাকার কথা পরিবার জানলেও কী অপরাধে তাঁকে বন্দি করা হয়েছিল, তা স্পষ্টভাবে জানতেন না স্বজনেরা। খবর বিবিসি।

সোমবার রাতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া এক নারী ও এক বাংলাদেশি পুরুষের পরিচয় প্রকাশ করে। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সৌদি আরবে যাওয়ার সময় জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেওয়া পরিচয়পত্রের তথ্য সাংবাদিকদের সরবরাহ করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নারীর পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল ২০২২ সালের মে মাসে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য তাঁকে বিএমইটির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সরকারি নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া কর্মীদের এ ধরনের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। এতে বিমা সুবিধা ও কল্যাণসেবা পাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ থাকে।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারীর বাড়ি ও বাবার পরিচয় সম্পর্কে তিনি মঙ্গলবার জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে তখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পাননি তিনি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত বুধবার তাঁরা প্রথম জানতে পারেন সৌদি আরবে ওই নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে খবরটি দেখার পর তাঁর বড় বোন বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন।

বড় বোন বলেন, এক বান্ধবী ফোন করে তাঁকে খবরটি জানান। পরে ভিডিও পাঠালে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।

পাঁচ বোনের মধ্যে ওই নারী ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সৌদি আরব থেকে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন তিনি। কারাগারে থাকার কথাও স্বজনদের জানিয়েছিলেন। তবে কী অভিযোগে বা কোন অপরাধে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছিল, তা বিস্তারিত বলেননি।

বড় বোনের ভাষ্য, একবার ওই নারী জানিয়েছিলেন, তাঁরা একই কক্ষে অনেক নারী থাকতেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন গাড়ি কেনার ঘটনায় মালিক তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। তবে এরপর কী ঘটেছিল, তা আর জানাননি তিনি। এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বেশি প্রশ্ন করতেও নিষেধ করেছিলেন। দেশে ফিরে বিস্তারিত জানাবেন বলেছিলেন।

পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস নিয়মিত যোগাযোগ করতেন ওই নারী। পরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একপর্যায়ে সৌদি আরবে থাকা অন্য একজনের কাছ থেকে তাঁর কারাগারে থাকার খবর পান স্বজনেরা।

ওই নারীর বোন জানান, মক্কা শরিফের ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করার কথা বলে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম ছয় মাস মেয়েটি নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। কারাগারে যাওয়ার পর টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।

ওই নারীর বাবা জানান, পাঁচ বছর আগে মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। প্রায় দুই বছর সংসার করার পর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। পরে ২০২৩ সালে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান তিনি। আগের সংসারে তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। নিজের বোনের মেয়েকে লালন-পালন করতেন তিনি।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি পুরুষের বিষয়ে ওই নারী কখনো পরিবারকে কিছু জানাননি বলেও দাবি করেছেন স্বজনেরা।

ওই নারীর ভাগ্নি জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগের সপ্তাহে বুধবার সৌদি আরবের কারাগার থেকে ফোন করেছিলেন তাঁর খালা। তবে টেলিফোন লাইনে সমস্যার কারণে সেদিন কথা বলা সম্ভব হয়নি।

সাধারণত ১৫ দিন বা এক মাস পরপর কারাগার থেকে ফোন করে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন তিনি। এর আগে মঙ্গলবারও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তবে সে সময় তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে কিছু জানতেন না।

ভাগ্নির ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানলে তাঁর খালা হয়তো ফোনে তা জানাতেন। কিন্তু শেষ কথোপকথনে এমন কিছু বলেননি তিনি।

মঙ্গলবার সকালে মির্জাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই নারীর বাড়ি ও পরিবার সম্পর্কে জেলা প্রশাসককে অবহিত করেন। তবে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ জানান, তখন পর্যন্ত তাঁরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

সৌদি আরবে এক বাংলাদেশি নারী ও এক পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর গত বুধবার দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে বাংলাদেশ বা সৌদি আরবের সরকার রোববার পর্যন্ত তাঁদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। পরে সোমবার রাতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় তাঁদের পরিচয় জানায়।

ওই নারীর মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা শোকাহত। তবে কোন অপরাধে ওই নারী মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য এবং মামলার নথি ছাড়া স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।