ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী স্টেশন ক্লাবের ভেতরে দুই সদস্যের হাতাহাতির এক বছর আগের ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। পুরোনো সেই ঘটনার জেরে এবার ক্লাবের দুই সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। তবে একই ঘটনায় দ্বিতীয় দফায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্লাবের সাবেক সভাপতি শাহ মোশাহিদ আলী। তাঁর দাবি, আগেই এ ঘটনার বিচার হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান কমিটির বক্তব্য, আগের প্রক্রিয়া ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে হয়নি। ফলে একটি পুরোনো হাতাহাতির ভিডিও ঘিরে সামনে এসেছে ক্লাবের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধ।
ভিডিওতে হাতাহাতি, চেয়ার নিয়ে উত্তেজনা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় সোয়া মিনিটের ভিডিওতে সিলেট স্টেশন ক্লাবের ভেতরে দুই সদস্যের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতির দৃশ্য দেখা যায়। একপর্যায়ে চেয়ার নিয়ে বাড়াবাড়ির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে আসেন ক্লাবের কয়েকজন সদস্য।
ক্লাবের দায়িত্বশীল নেতা ও একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনাটি ২০২৫ সালের নভেম্বরের। সে রাতে ক্লাবের কালচারাল রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন সদস্য সায়েক খান, আব্দুল্লাহ আহমদসহ কয়েকজন। একপর্যায়ে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সায়েক ও আব্দুল্লাহর মধ্যে তর্ক শুরু হয়। কথা-কাটাকাটি ক্রমে উত্তেজনায় রূপ নেয়, পরে তা গড়ায় হাতাহাতিতে।
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এগিয়ে আসেন ক্লাবের সিনিয়র সদস্য মাহবুব আহমদ ও সাইফুদ্দিন খালেদ। ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন আরেক সদস্য জাকির আহমদ।
ক্লাবের সদস্য সাইফুদ্দিন খালেদ জানান, ঘটনার পরদিনই জাকির আহমদ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। পরে ভিডিওর সূত্র ধরে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্তে আসে। তবে সে সময় তদন্তের অগ্রগতি বেশি দূর এগোয়নি বলে তাঁর ভাষ্য।
এক ঘটনার দুবার বিচার!
ক্লাবের বর্তমান দায়িত্বশীলদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে বর্তমান সভাপতি সায়েকুর রহমান সাক্কুসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত সোমবার ক্লাবের সভায় সায়েক খান ও ভিডিও ধারণকারী জাকির আহমদকে বিভিন্ন মেয়াদে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আব্দুল্লাহ আহমদের বিষয়ে তখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা পরবর্তী বৈঠকে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ক্লাবের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক বিষয়ে সাবেক সভাপতি শাহ মোশাহিদ আলীকেও সতর্ক করা হয়েছে।
বর্তমান কমিটির দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের বিষয়টিও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ভিডিও ধারণকারী সদস্য তদন্ত কমিটির কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করেই নতুন করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমান কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তুলেছেন সাবেক সভাপতি শাহ মোশাহিদ আলী। তাঁর দাবি, তিনি সভাপতি থাকাকালে কয়েক মাস আগেই এ ঘটনার বিচার করেছিলেন। তখন একজন সদস্যকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারও করা হয়েছিল। ফলে একই ঘটনায় আবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অগঠনতান্ত্রিক। শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, একটি ঘটনার বিচার একাধিকবার হতে পারে না। তাঁকে সতর্ক করার বিষয়টিও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। এ বিষয়ে ক্লাবের আগামী বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) বক্তব্য তুলে ধরলে ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে ক্লাবের পরিচালক (ফাইন্যান্স) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য, আগের সভাপতি যে প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, তা ক্লাবের গঠনতন্ত্রের নির্দেশনা অনুসরণ করে করা হয়নি। এ কারণে বর্তমান কমিটি বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করেছে। তাঁর দাবি, ক্লাবের স্বার্থে নিয়ম মেনেই সংশ্লিষ্ট সদস্যদের সতর্ক ও সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, বর্তমান কমিটির নতুন সিদ্ধান্তের পরই পুরোনো ভিডিওটি আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সমান ভোট থেকে নেতৃত্বের বিরোধ!
স্টেশন ক্লাবের এই বিরোধের পেছনে রয়েছে নেতৃত্ব নির্বাচন ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। ক্লাবের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নির্বাচনে সভাপতি পদে সায়েকুর রহমান সাক্কু ও শাহ মোশাহিদ আলী সমান ভোট পান। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে দুজনকে ছয় মাস করে সভাপতির দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
প্রথম ছয় মাস দায়িত্ব পালন করেন শাহ মোশাহিদ আলী। পরে তিনি সহসভাপতিকে সঙ্গে নিয়ে পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সায়েকুর রহমান সাক্কু দায়িত্ব গ্রহণ করলে দুই পক্ষের বিরোধ আরও তীব্র হয়। এ বিরোধের জেরে শাহ মোশাহিদ আলীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাবের ব্যাংক হিসাবও তিন মাস বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছেন সদস্যরা। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
ক্লাবের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব; সব মিলিয়ে ভেতরে ভেতরে চলা বিরোধের মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে হাতাহাতির পুরোনো ভিডিও। সদস্যদের একাংশের ধারণা, চলমান বিরোধের প্রেক্ষাপটেই ভিডিওটি আবার আলোচনায় এসেছে। তবে ভিডিওটি নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কারা রয়েছেন, তা জানা যায়নি।
থানায় সাধারণ ডায়েরি, আইনি পরামর্শ নিচ্ছে ক্লাব
ভিডিওটি নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সভাপতি সায়েকুর রহমান সাক্কু। তাঁদের পরামর্শের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা সিলেট স্টেশন ক্লাবের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন আর কেবল একটি পুরোনো হাতাহাতির ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। ভিডিও প্রকাশ, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, গঠনতন্ত্রের ব্যাখ্যা এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব; সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
(সূত্র: মানবজমিন)