প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:০৬ (শুক্রবার)
৪৩০ রানের পাহাড় ডিঙিয়ে লঙ্কানদের অবিশ্বাস্য জয়, শেষ ওভারে রুদ্ধশ্বাস মহাকাব্য

ছবি: সংগৃহীত

ক্রিকেট কখনো কখনো নিছক একটি খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জীবন্ত উপাখ্যান। যেখানে পরিসংখ্যানের কঠিন হিসাবও হার মানে সাহসের কাছে, যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকে আশার প্রদীপ। তেমনই এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্যের জন্ম দিল শ্রীলঙ্কা। ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪৩০ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে ইংল্যান্ডকে ২ উইকেটে হারিয়ে রীতিমতো ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাল লঙ্কানরা।

ত্রিদেশীয় সিরিজের এই ম্যাচে দুই দলের ব্যাটাররা মিলে তুলেছেন ৮৫৯ রান। চার-ছক্কার উৎসবে রাঙানো ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে রোমাঞ্চের চূড়ান্ত নাট্যমঞ্চ। আর সেই নাটকের শেষ দৃশ্যে নায়ক জানিথ লিয়াঙ্গে-যার ব্যাট থেকে আসা এক ছক্কায় নিশ্চিত হয় শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য জয়।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে ওয়ানডেতে নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার কীর্তি গড়েছে শ্রীলঙ্কা। আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে সফল রান তাড়ার তালিকায় এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৩৫ রান তাড়া করে জিতে আজও শীর্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই রেকর্ডের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেল লঙ্কানরা।

শুরুতেই অন্ধকার, তারপর প্রতিরোধের গল্প
৪৩০ রানের লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাট করতে নেমে শ্রীলঙ্কার শুরুটা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাত্র ২৪ রানেই ফিরে যান দুই টপঅর্ডার ব্যাটার। ১৬ বলে ১৮ রান করে সাজঘরে ফেরেন কামিন্দু মেন্ডিস। অন্যদিকে কোনো বল খেলার আগেই রানআউট হয়ে বিদায় নেন অধিনায়ক কুশল মেন্ডিস।

মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে ম্যাচের সমীকরণ। বিশাল লক্ষ্য, শুরুতেই জোড়া ধাক্কা; সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার সামনে তখন যেন দাঁড়িয়ে ছিল এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর।

কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্য এখানেই। পতনের মুখেও কেউ কেউ দাঁড়িয়ে যায় বুক চিতিয়ে। আভিস্কা ফার্নান্দো ও পবন রত্নায়েক ঠিক সেই কাজটিই করলেন। ধৈর্য আর আগ্রাসনের মিশেলে দুজন গড়লেন ১৬৬ রানের দুর্দান্ত জুটি। ভেঙে পড়া ইনিংসে ফিরল প্রাণ, নিভে আসা আশার আলো আবার জ্বলে উঠল।

সেঞ্চুরির খুব কাছেই পৌঁছে গিয়েছিলেন আভিস্কা। তবে মাত্র তিন রানের আক্ষেপ নিয়ে থামতে হয় তাঁকে। ৮৩ বলে ৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে বিদায় নেন এই ব্যাটার। তাঁর ব্যাটে লেখা হয়েছিল ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, আর সেই গল্পের পরের অধ্যায় লিখতে এগিয়ে আসেন রত্নায়েক।

রত্নায়েক-শানাকার ব্যাটে ঝড়, বদলে গেল ম্যাচের চিত্র
ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হয়ে যায় চতুর্থ উইকেট জুটিতে। পবন রত্নায়েক ও দাসুন শানাকা যেন ইংলিশ বোলারদের ওপর নামিয়ে আনেন ব্যাটিংয়ের এক প্রলয়ংকরী ঝড়। মাত্র ৭৯ বলে ১৩৩ রানের জুটি গড়ে তাঁরা ম্যাচের পাল্লা ঘুরিয়ে দেন শ্রীলঙ্কার দিকে।

রত্নায়েকের ব্যাটে ছিল পরিণত এক সেঞ্চুরির গল্প। ১০৬ বলে ১৩০ রান করে থামেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৫টি চার ও তিনটি ছক্কা। প্রতিটি বাউন্ডারিতে যেন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছিল ইংল্যান্ডের আত্মবিশ্বাস।

অন্য প্রান্তে শানাকা ছিলেন আরও বিধ্বংসী। মাত্র ৫০ বলে ৯৭ রান-চার-ছক্কায় সাজানো এক বিস্ফোরক ইনিংস। ছয়টি চার ও আটটি ছক্কায় ইংলিশ বোলিংকে কার্যত দিশেহারা করে দেন তিনি। সেঞ্চুরি থেকে মাত্র তিন রান দূরে থামলেও তাঁর ব্যাটে জয়ের ভিত তখন শক্ত হয়ে গেছে।

তবে ক্রিকেটের গল্প কখনো সরলরেখায় এগোয় না। জয়ের সুবাস পেয়েও লঙ্কানদের অপেক্ষা করতে হয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

শেষ ওভারে টানটান উত্তেজনা, শেষ হাসি লিয়াঙ্গের
শায়ান আচার্যেকে সঙ্গে নিয়ে জয়ের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় শ্রীলঙ্কা। মনে হচ্ছিল, ইতিহাস বুঝি হাতের মুঠোয়। কিন্তু শেষ ওভারে বল হাতে এসে ম্যাচে নতুন প্রাণ ফেরান ইংলিশ পেসার জশ টাং।

ওভারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে পরপর দুটি উইকেট তুলে নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেন লঙ্কানদের। মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। গ্যালারিতে উত্তেজনা, মাঠে চাপ, আর কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর চোখ তখন শেষ বলের সমীকরণে।

একসময় হিসাব দাঁড়ায়; দুই বলে চাই ছয় রান। এক ছক্কাই পারে সব হিসাব মেলাতে, আর ব্যর্থতা মানেই ইংল্যান্ডের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন।

ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে জানিথ লিয়াঙ্গে। কাঁধে তখন পুরো দলের স্বপ্ন, কোটি সমর্থকের প্রত্যাশা। পঞ্চম বলে ব্যাট ঘুরল, বল উড়ল সীমানার ওপারে। ছয়!

এক আঘাতেই শেষ হলো সব উৎকণ্ঠা। অসম্ভবের দেয়াল ভেঙে আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটাল শ্রীলঙ্কা। ২৭ বলে ৬০ রানে অপরাজিত থেকে লিয়াঙ্গে হয়ে উঠলেন এই মহাকাব্যের শেষ দৃশ্যের নায়ক।

ব্রুকের দ্বিশতক, জ্যাকসের ঝড়-তবু জয় অধরা ইংল্যান্ডের
এর আগে ব্যাট হাতে ইংল্যান্ডও কম তাণ্ডব চালায়নি। উদ্বোধনী জুটিতে ৭৪ রান তুলে ভালো সূচনা এনে দেন দুই ওপেনার। টম ব্যান্টন করেন ৫০ রান, আর অন্য ওপেনার থামেন ২৯ রানে। এরপর জো রুটের ব্যাটে আসে ৬৯ রানের পরিণত ইনিংস। ৬৬ বলে তাঁর এই সংগ্রহ ইংল্যান্ডের ইনিংসকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে আসল ঝড়টি আসে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক ও উইল জ্যাকসের ব্যাটে। দুজন মিলে মাত্র ৭৭ বলে গড়েন ১৮৫ রানের বিধ্বংসী জুটি। বাউন্ডারির পর বাউন্ডারি, ছক্কার পর ছক্কা-শ্রীলঙ্কার বোলারদের জন্য যেন কোনো উত্তরই অবশিষ্ট ছিল না।

মাত্র ১১৪ বলে ডাবল সেঞ্চুরি করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন ব্রুক। শেষ বলে আউট হওয়ার আগে ১১৬ বলে তাঁর সংগ্রহ ২০২ রান। অন্যদিকে মাত্র ৩০ বলে ৬৬ রান করে অপরাজিত থাকেন জ্যাকস। তাঁদের ব্যাটিংয়ে ভর করে ইংল্যান্ড দাঁড় করায় ৪৩০ রানের বিশাল পাহাড়।

কাগজে-কলমে এমন স্কোর ছিল জয়ের জন্য যথেষ্ট বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে কাগজের হিসাব সব সময় শেষ কথা বলে না। কখনো কখনো ব্যাটারদের সাহস, মুহূর্তের সিদ্ধান্ত আর শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা বদলে দেয় গোটা ইতিহাস।

যে জয় শুধু জয় নয়, এক অমর ক্রিকেটগাথা
শ্রীলঙ্কার এই জয় কেবল দুটি পয়েন্ট কিংবা একটি ম্যাচ জেতার গল্প নয়। এটি আত্মবিশ্বাসের গল্প, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়ার গল্প।

৪৩০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই দুই উইকেট হারানো দলটি শেষ পর্যন্ত জিতেছে দুই উইকেটে। মাঝপথে আভিস্কা, রত্নায়েক ও শানাকার ব্যাটে জন্ম নিয়েছে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন; আর শেষ অধ্যায়ে লিয়াঙ্গের ছক্কা সেই স্বপ্নকে দিয়েছে পূর্ণতা।

অন্যদিকে ২০২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেও জয় উদ্‌যাপন করতে পারেননি হ্যারি ব্রুক। ব্যক্তিগত কীর্তির উজ্জ্বলতা ঢাকা পড়ে গেছে দলের পরাজয়ের ছায়ায়।

ক্রিকেটের সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই; এক দল যখন জয়ের আনন্দে ভাসে, অন্য দল তখন বুঝতে পারে, অসাধারণ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সও সব সময় কাঙ্ক্ষিত পরিণতি এনে দেয় না।

৪৩০ রানের পাহাড় ডিঙিয়ে শ্রীলঙ্কা আজ শুধু একটি ম্যাচ জেতেনি; তারা লিখেছে এমন এক রূপকথা, যার শেষ লাইনটি উচ্চারিত হয়েছে জানিথ লিয়াঙ্গের ব্যাটে উড়ে যাওয়া ছক্কার শব্দে। আর সেই শব্দে আবারও প্রমাণিত হয়েছে; ক্রিকেটে শেষ বলের আগে কোনো গল্পই শেষ হয়ে যায় না।