প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:৩৭ (শুক্রবার)
মালয়েশিয়ায় বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি বিকাশে সহযোগিতার আশ্বাস হাইকমিশনারের

ছবি: সংগৃহীত

মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চা বাড়ানো এবং প্রবাসীদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে পরিচালিত আর্টস, কালচার অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ প্রোগ্রামের (এসিএলপি) কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী। এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য কল্যাণকর উল্লেখ করে এর কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ হাইকমিশনারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় এসিএলপির গত চার মাসের কার্যক্রম, অর্জন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, অভিভাবকদের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা তুলে ধরেন মালয়েশিয়া বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন (এমবিএফএ) ও এসিএলপির প্রতিনিধিরা।

সভায় হাইকমিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান, কনস্যুলার ফিরোজ রব্বানী ও ফার্স্ট সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) ফাল্গুনী বাগচী উপস্থিত ছিলেন। এমবিএফএর সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাধারণ সম্পাদক মো. রুহুল আমিন সরকার, সদস্যকল্যাণবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ও এসিএলপির আহ্বায়ক মাহফুজ কায়সার অপু, এসিএলপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুশফিক আহমেদ চৌধুরী এবং এমবিএফএর জনসংযোগবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ফরহাদ হোসেনও সভায় অংশ নেন। এ সময় এসিএলপির কার্যক্রম, অর্জন, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসংবলিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন হাইকমিশনারের কাছে উপস্থাপন করা হয়।

গত ৭ জুন ২০২৬ কুয়ালালামপুরের সেতিয়াওয়াংসায় আনুষ্ঠানিকভাবে এসিএলপির কার্যক্রম শুরু হয়। প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশু-কিশোরদের মাতৃভাষা, জাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের আত্মিক বন্ধন সুদৃঢ় করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের জন্য বাংলা ভাষা শিক্ষা, পবিত্র আল-কোরআন শিক্ষা, চিত্রাঙ্কন, নৃত্য ও সংগীতের কার্যক্রম চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বহুমুখী শিক্ষাগত ও পেশাগত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে কর্মসূচির পরিধি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রসারিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে মালয় ভাষা শিক্ষা কোর্স। এর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের স্থানীয় ভাষায় যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষেত্রে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষার্থী ও গবেষকদের দক্ষতা বাড়াতে গবেষণাপদ্ধতিবিষয়ক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণাপদ্ধতি, গবেষণাপত্র প্রণয়ন, তথ্যসূত্র ব্যবস্থাপনা ও একাডেমিক প্রকাশনায় দক্ষ করে তুলতে এ কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাপ্তবয়স্কদের ধর্মীয় শিক্ষার চাহিদা বিবেচনায় শুদ্ধ উচ্চারণ, তাজবিদ ও সাবলীলভাবে পবিত্র আল-কোরআন তিলাওয়াত শেখানোর কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সম্প্রসারিত কার্যক্রমে।

মতবিনিময় সভায় প্রবাসী বাংলাদেশি অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভবিষ্যতে এমবিএফএ স্কুল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

এমবিএফএর প্রতিনিধিদের মতে, মালয়েশিয়ায় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুদের জন্য এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় ও নিজস্ব শিকড় সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রবাসে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা অনেক শিশুর দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ বাস্তবতায় ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিনিধিরা।

এসিএলপির কার্যক্রমের প্রশংসা করে হাইকমিশনার বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে কর্মসূচিটির সম্প্রসারণ প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি এসিএলপির কার্যক্রম সুষ্ঠু ও ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা, এর পরিধি সম্প্রসারণ এবং আরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে শিক্ষামূলক সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।

সভায় এসিএলপির কার্যক্রমের অগ্রগতি, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

মতবিনিময় সভা শেষে হাইকমিশনারের আন্তরিক উৎসাহ, মূল্যবান দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতার আশ্বাসের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এমবিএফএ ও এসিএলপির প্রতিনিধিরা। তাঁদের প্রত্যাশা, হাইকমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় এ উদ্যোগ মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাষা-সংস্কৃতি চর্চা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও বিস্তৃত হবে।