প্রকাশিত : ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:১৬ (রবিবার)
কোথায় যায় সিলেটের রেলের টিকেট? সবাই জানেন, তবু কেউ জানেন না! 

ছবি: সংগৃহীত

সিলেট থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেনের টিকেটের চাহিদা অন্তত ১০ হাজার। বিপরীতে ছয়টি ট্রেনে সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ভিআইপি-ভিভিআইপিসহ দৈনিক যাত্রা করতে পারেন সর্বোচ্চ দেড় হাজার জনের মতো সৌভাগ্যবান যাত্রি। তারাও নিজেদের আইডি দিয়ে টিকেট কিনেছেন কিনা তা যাচাই করছে জেলা প্রশাসন। এ নিয়ে তদন্ত করছে পিবিআই। বাতিল হচ্ছে অনলাইন অ্যাপ প্রতিষ্ঠানের চুক্তি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই সংকট সমাধানে রেল, রেলের কামরা বা আসন বরাদ্দ বাড়ানোর কোনো বিকল্প আপাতত নেই।

সংকটের মূলে থেকে যাচ্ছে চাহিদা আর বরাদ্দের ফারাক। রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অতি সীমিত হওয়ায় টিকেটের জন্য এমন হাহাকার। তাছাড়া সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। ৬ লেনে উন্নীতির ধীরগতির কাজের জন্য এই সড়ক প্রায় চলাচলের অনুপযোগী। প্রতিদিনই লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট। সড়কের দুরাবস্থার মধ্যে রেলের এই সংকট তৈরি করেছে চরম ভোগান্তি।

সিলেট রুটের সবগুলো ট্রেনেই আসন সংখ্যার দ্বিগুণ যাত্রি নিয়ে অস্বস্তিকর যাত্রা করতে হয়। রেল ও রেলপথের জরাজীর্ণ দশার সাথে ঘন ঘন দুর্ঘটনা, বনে-জঙ্গলে আটকে থাকা আর শিডিউল বিপর্যয় এই রুটে নিয়মিত ঘটনা। এতো বিপত্তির পরও এই রুটের ট্রেনের টিকেট মুহূর্তেই ‘নাই’ হয়ে যায়।

সিলেট থেকে ঢাকার পথে কালনী, জয়ন্তীকা, পারাবত ও উপবন এবং চট্টগ্রামের পথে চলাচল করে পাহাড়িকা ও উদয়ন একপ্রেস। আন্তঃনগর এই ছয়টি ট্রেনের টিকেট বুকিং দিতে হয় অনলাইন অ্যাপ ‘সহজ’এ। চলতি মাসে এ নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেছেন জেলার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল নোমান। ‘ট্রেনের টিকেট কোথায় যায়’ বিষয়টি পিবিআইকে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছেছে। 

মামলার নথিতে বলা হয়েছে, একটি চক্র টিকিট কালোবাজারে জড়িত। তারা ট্রেনের টিকিট সরিয়ে নিয়ে পরে তা বেশি টাকায় সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে। এ ধরনের কর্মকা- সাধারণ যাত্রীদের হয়রানির পাশাপাশি সিলেটের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শেষ খবর হচ্ছে, অনলাইন অনলাইন টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে আছে, টিকিট ছাড়ার আগেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশেষ অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট আইডি ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগ। টিকিট বিক্রির এমন প্রায় ১৬৯টি অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে টিকিট কালাবাজারিতে সহজের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা শুরু করেছে রেলওয়ে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন একটি টিকিটিং এজেন্সির জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

কালাবাজারি রোধে রেলওয়ে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্লক করেছে বলে জানান বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন ।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে বুধবার নির্ধারিত সময়ের এক ঘন্টা দেরিতে দুপুর একটায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস। ট্রেনটির সাড়ে সাতশ আসনের মধ্যে সিলেট থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২৩০টি আসন। তবে স্ট্যান্ডিং টিকেট নিয়ে শুরুর স্টেশনেই যাত্রি ছিল প্রায় উপচে পড়া।

দশ দিন আগে অনেক যুদ্ধ করে একটি টিকেট বুকিং দিতে পেরেছিলেন জানিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জয় আহমেদ বলেন, রেলওয়ের অনলাইন বুকিং অ্যাপ সহজকে নিয়ে প্রশ্ন আছে। এটা, হয় অ্যাপ হ্যাক হচ্ছে অথবা যারা অ্যাপ চালান তারা টিকেট কালোবাজারের সাথে জড়িত। বৈধভাবে পাওয়া না গেলেও অনেকে বেশি টাকায় বাইরে থেকে টিকেট কিনছেন।

তিনি বলেন, আমার বাড়ি মাদারিপুরে। ঢাকা পর্যন্ত রেলেই যাতায়াত করি। আটটায় অনলাইনে টিকে ছাড়ে, ঠিক সময়ে লগইন করা অ্যাপ অটো লগআউট হয়ে যায়। তার পর যাত্রার নির্ধারিত তারিখের দশদিন আগে ছাড়া টিকেট কয়েক মিনিটেই নাই হয়ে যায়। শুধু সৌভাগ্যবানরাই টিকেট পান।

সপরিবারে সিলেট বেড়িয়ে জয়ন্তীকা এক্সপ্রেসে করে ফিরে যাচ্ছিলেন আব্দুল আহাদ। তিনি বলেন, আমার বাড়ি কুষ্টিয়া এলাকায়। আমাদের এলাকায় এসি কামরায় অযাচিত কাউকে ঢুকতে দেখে অভ্যস্ত নই। কিন্তু সিলেটে কালনীতে এলাম, জয়ন্তীকায় যাচ্ছি, দুই ট্রেনেই এসি কামরার সিটের হাতলের মধ্যেও মানুষ বসে থাকে। তাদের টিকেট থাকে কি না তাও জানি না।

অনেকেই স্ট্যান্ডিং টিকেট করেন জানিয়ে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, রেলের টিকিট অনলাইনে কিনতে হয়। কেউ কেউ সরাসরি কাউন্টার থেকেও কেনেন। টিকিট বিক্রিতে স্টেশন কর্তৃপক্ষের কোনো হাত নেই।

তিনি বলেন, সাতশ থেকে সাড়ে সাতশ যাত্রি নিয়ে যাত্রা করে ট্রেনগুলো। সিলেট থেকে রেজিস্ট্রেশনকৃত যাত্রি আছেন ৪০ হাজারের ওপরে, অন্যদিকে প্রতিদিন টিকেট আছে হাজার থেকে বারোশ। সংকট খুবই স্বাভাবিক। প্রতি যাত্রায় অতিরিক্ত কামরা যোগ করার চেষ্টা করি আমরা। তবে সেটাও খুব সামান্য।

এদিকে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত মাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ফেসবুক পেজ, ব্যক্তি বা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে ট্রেনের টিকিট না কিনতে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সম্প্রতি সংস্থাটির ওয়েবসাইটে সতর্কবার্তায় বলা হয়, ‘রেল সেবা’ অ্যাপ অথবা অনুমোদিত টিকিট কাউন্টার ছাড়া টিকেট কিনে প্রতারিত বা ক্ষতির শিকার হলে তার দায় নেবে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। এছাড়া যাত্রীদের পাসওয়ার্ড, ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি), জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যসহ অন্যান্য গোপনীয় তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।