প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১২ (মঙ্গলবার)
হ্যারি কেইন ইংল্যান্ডের ৫ম ব্যালন ডি’অর জয়ী

ব্যালন ডি’অর জয়ী অ্যালেক্সিস পুতেয়াস ও হ্যারি কেইন (ছবি: সংগৃহীত)

একসময় ট্রফি না জেতার আক্ষেপে তাঁকে শুনতে হয়েছে ‘লুজার’ অপবাদ। শৈশবে আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দল থেকেও বাদ পড়েছিলেন তিনি। অথচ সেই হ্যারি কেইনের হাতেই উঠেছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর। দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য প্রত্যাখ্যান আর অবিচল আত্মবিশ্বাসের পথ পেরিয়ে ৩৩ বছর বয়সে এসে সাফল্যের সোনালি মুকুট পরেছেন ইংল্যান্ডের এই স্ট্রাইকার। এখন ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন প্রশ্ন-ব্যালন ডি’অরের পর কি তবে নামের আগে ‘স্যার’ বসতে যাচ্ছে হ্যারি কেইনের?

নয় বছর আগের সেই সন্ধ্যা। লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে বসেছিল ফুটবল তারকাদের মিলনমেলা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার, সের্হিও রামোস-বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকাদের ভিড়ে ছিলেন হ্যারি কেইনও। তবে তখন তিনি ছিলেন দূরের এক দর্শক, রাজসভার সদস্য নন।

২০১৭ সালের সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেইন কি কল্পনা করেছিলেন, একদিন ঠিক এই জায়গাতেই তাঁর হাতে উঠবে ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত পুরস্কার? সময়ের পরিহাস, নয় বছর পর সেই প্যালাডিয়াম থিয়েটারেই তাঁকে ঘিরে আলো, ক্যামেরা আর করতালির ঝলকানি।

এবারের মঞ্চে ছিলেন লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে, রদ্রিসহ ফুটবলের বর্তমান প্রজন্মের সেরা তারকারা। কিন্তু আলো কেড়ে নিলেন কেইন। জন্মস্থান লন্ডনের লেইটনস্টন থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরের সেই থিয়েটারে যেন পূর্ণ হলো তাঁর দীর্ঘ ফুটবলযাত্রার এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।

কেইনের সাফল্যের গল্পে কোনো জাদুর কাঠি নেই। আছে প্রত্যাখ্যান, কঠোর পরিশ্রম আর নিজের ওপর বিশ্বাস ধরে রাখার দীর্ঘ লড়াই।

ছোটবেলায় আর্সেনালের বয়সভিত্তিক দলে খেলতেন তিনি। কিন্তু শারীরিক গড়ন ও অ্যাথলেটিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একসময় তাঁকে ছেড়ে দেয় ক্লাবটি। তখন কে ভেবেছিল, সেই ছেলেই একদিন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মানের মঞ্চে দাঁড়াবেন!

এরপর টটেনহাম হটস্পারে কেটেছে তাঁর ক্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৯ বছর। গোল করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু দলীয় শিরোপার আক্ষেপ যেন পিছু ছাড়েনি তাঁকে।

ফুটবলে গোলদাতার নাম মনে রাখে সবাই, কিন্তু ট্রফি না থাকলে সেই কীর্তির মূল্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কেইনকেও শুনতে হয়েছে ‘লুজার’ অপবাদ। ব্যক্তিগত অর্জনের পাহাড় জমলেও দলীয় শিরোপার ঘরে শূন্যতা নিয়ে তাঁকে বারবার সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।

২০২৩ সালে তাই নিলেন কঠিন এক সিদ্ধান্ত। শিরোপার স্বপ্ন পূরণে ইংল্যান্ড ছেড়ে পাড়ি জমালেন জার্মানিতে, যোগ দিলেন বায়ার্ন মিউনিখে। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ-কিন্তু লক্ষ্য একটাই, নিজের সামর্থ্যের পূর্ণ স্বীকৃতি আদায় করা।

এরপর যেন বদলে গেল গল্পের গতিপথ। গোলের পর গোল, রেকর্ডের পর রেকর্ড। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত মৌসুমে বায়ার্ন ও ইংল্যান্ডের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেছেন কেইন। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সই তাঁকে ব্যালন ডি’অরের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

একসময় যাঁকে নিয়ে সংশয় ছিল, আজ তাঁকেই ঘিরে প্রশংসার ঢেউ। ‘লুজার’ অপবাদ পেছনে ফেলে কেইন এখন ব্যালন ডি’অরজয়ী; যে স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘদিনের সংগ্রামকে দিয়েছে নতুন অর্থ।

২০০১ সালে মাইকেল ওয়েন ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন কেইন। ওয়েন যখন এই পুরস্কার জিতেছিলেন, তখন কেইন ছিলেন আট বছরের শিশু। 

এবার ইংল্যান্ডের পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অরের বিজয়ীদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে তাঁর নাম। এর আগে এই সম্মান পেয়েছেন স্যার স্ট্যানলি ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওয়েন।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আগে সঞ্চালকদের আলোচনায় উঠে এসেছিল মজার একটি প্রসঙ্গ; কেইন জিতলে তাঁকে কি ‘স্যার হ্যারি কেইন’ বলে ডাকতে হবে?

ব্রিটেনে নাইটহুড বা ‘স্যার’ উপাধি আনুষ্ঠানিক সম্মানের বিষয়। ব্যালন ডি’অর জিতলেই কারও নামের আগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই উপাধি যুক্ত হয় না। তবে ইংল্যান্ডের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে কেইন যে বিশেষ সম্মানের জায়গা করে নিয়েছেন, তা বলাই যায়।

ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওর কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণের পর তিনি স্মরণ করেছেন টটেনহামকে। যে ক্লাবে শিরোপা না জেতার আক্ষেপে এত সমালোচনা সহ্য করেছেন, সেই ক্লাবের অবদানও ভুলে যাননি। ক্যারিয়ারে যেসব কোচের অধীনে খেলেছেন, তাঁদের প্রতিও জানিয়েছেন কৃতজ্ঞতা।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি কেইনকে পরিশ্রম ও প্রতিভার অনন্য সমন্বয় হিসেবে তুলে ধরেন।

আটটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতেছেন স্প্যানিশরা। মেয়েদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। এটি তাঁর তৃতীয় ব্যালন ডি’অর। আইতানা বোনমাতির সর্বোচ্চ তিনবার জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসালেন পুতেয়াস। মেয়েদের ব্যালন ডি’অর টানা ষষ্ঠবার গেল স্পেনে।