প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:১৯ (মঙ্গলবার)
রমজানে বাড়তি চাহিদা কাটিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখতে যে পরিকল্পনা বাণিজ্যমন্ত্রীর

আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও দাম সহনীয় রাখতে আমদানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, শুল্ক কাঠামো সহজ করা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল ও খেজুরের আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। স্থানীয় বাজারে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও মসুর ডালের দামও কমেছে।

সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। রমজানে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়।

বেড়েছে নিত্যপণ্যের আমদানি

ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন।

এ সময়ে চিনি আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৫৩ হাজার মেট্রিক টন বেশি। ছোলা আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার মেট্রিক টনে। গত বছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১২ হাজার মেট্রিক টন।

এ ছাড়া মসুর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি। খেজুর আমদানি হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার মেট্রিক টন।

আমদানির পাশাপাশি এসব পণ্যের ঋণপত্র খোলার পরিমাণও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আমদানি বৃদ্ধির ফলে রমজানে বাড়তি চাহিদা মোকাবিলা করা সহজ হবে।

কমেছে ডিম-মুরগি ও ডালের দাম

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খুচরা বাজারে ডিমের দাম ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৫০ টাকায়। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় নেমেছে।

বড় দানার মসুর ডালের দাম গত এক মাসে ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বড় দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়।

অন্যদিকে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ২০৪ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। চিনির দাম প্রতি কেজি ১১০ থেকে ১১৫ টাকা। সাধারণ মানের খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকায়।

খেজুরের শুল্ক সহজ করার উদ্যোগ

রমজানে খেজুরের দাম সহনীয় রাখতে আমদানি শুল্ক কাঠামো সহজ, স্বচ্ছ ও যৌক্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

সভায় তিনি বলেন, মিশর, সৌদি আরব, ইরাক ও আলজেরিয়াসহ প্রায় এক ডজন দেশ থেকে বিভিন্ন মানের খেজুর আমদানি করা হয়। জাত, গুণগত মান ও মূল্যের পার্থক্যের কারণে একই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আমদানিকারকদের জন্য সহজবোধ্য ও বাস্তবসম্মত শুল্কব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

শুল্ক নির্ধারণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্ব হলেও কার্যকর সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সভায় খেজুরের প্রচলিত শুল্ক সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি নির্দিষ্ট মূল্য ধরে শুল্কায়নের পরিবর্তে খেজুরের প্রকৃত গুণগত মান ও মূল্যের ভিত্তিতে কর নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

আমদানিকারকেরা জানান, প্রকৃত আমদানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শুল্কায়ন না হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও ঋণপত্র খোলার জটিলতা যুক্ত হলে বাজারে সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আন্তর্জাতিক বাজারেও নজর

সভায় জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল ও ছোলার দাম কিছুটা বাড়লেও মসুর ডালের দাম কমেছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও স্থানীয় সরবরাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বর্তমানে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানিতে শুল্ক-কর নেই। তবে চিনি ও ফল আমদানির শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক সমন্বয় করা গেলে বাজারদর সহনীয় রাখতে সহায়ক হতে পারে বলে সভায় আলোচনা হয়।

পোল্ট্রি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে ডিম ও মুরগির উৎপাদন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। খামার পর্যায়ে ডিমের দাম কমে উৎপাদন খরচের কাছাকাছি এসেছে। খামারে রোগবালাইয়ের উল্লেখযোগ্য প্রকোপ না থাকায় উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা নেই বলেও জানান তাঁরা।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।