প্রকাশিত : ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:১৮ (মঙ্গলবার)
বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিককে রুশ বাহিনীতে নিয়োগে প্রতারণা

ছবি: সংগৃহীত

বেসামরিক চাকরি ও আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ অন্তত ২৯টি দেশের নাগরিককে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। এসব বিদেশি নাগরিকের অনেকেই যুদ্ধে নিহত, আহত, বন্দি কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত কমিশনের এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিককে রুশ বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা তদন্ত করে ২৯টি দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রতারণা ও জবরদস্তির সরাসরি প্রমাণ পেয়েছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তান রয়েছে। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা এ ধরনের নিয়োগের শিকার হয়েছেন।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীরা ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ। তাঁদের বড় অংশ আর্থসামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁদের ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়।

বাংলাদেশিদের যেভাবে নিয়োগের ফাঁদে ফেলা হয়

প্রতিবেদনে বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণের কথা বলা হয়েছিল। নথিপত্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে দেখানো হলেও এর আড়ালে রুশ বাহিনীতে লোক নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়।

এক ভুক্তভোগী বাংলাদেশির স্ত্রীর বক্তব্য প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, “পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে শুধু রুশ ভাষায় লেখা চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় আমার স্বামীকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি, আর কোনো উপায় ছিল না।”

অল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর পর বিদেশি নাগরিকদের খুব অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখসারির বিপজ্জনক দায়িত্বে পাঠানো হয়। এতে তাঁদের জীবনহানি ও নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছে। দালালদের অর্থ দিতে অনেকে সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করেছেন কিংবা ঋণ নিয়েছেন। কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকারী ও পাচারকারী চক্র পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

মানবপাচার বলছে জাতিসংঘের কমিশন

সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কমিশন এসব ঘটনাকে মানবপাচার ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে নিয়োগকারী চক্র এবং রুশ কর্তৃপক্ষের উচ্চপর্যায়ের সমন্বয়ের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

কমিশন রাশিয়াকে অবিলম্বে এ ধরনের বিদেশি নাগরিক নিয়োগ বন্ধ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট পাচারকারীদের বিচারে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং মানবপাচার প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

আগেও সতর্ক করেছিল ব্র্যাক

এর আগেও প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশিদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর বিষয়ে সতর্ক করেছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছিল, গত কয়েক বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন বিদেশে চাকরির প্রলোভনে মানবপাচারের ঝুঁকি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগের ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে।