ছবি: সংগৃহীত
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে চালু হওয়া গ্রাম সরকার ব্যবস্থা নতুন করে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত আইনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে ১৭ সদস্যের একটি করে গ্রাম সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
সবকিছু ঠিক থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষে এ ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৫৬৮টি ইউনিয়নের ৪১ হাজার ১১২টি ওয়ার্ডে গ্রাম সরকার গঠিত হলে এতে প্রায় সাত লাখের বেশি সদস্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি যুক্ত হতে পারেন। তবে খসড়াটি এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে; চূড়ান্ত আইন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।
বিএনপি নেতাদের মতে, গ্রাম সরকার চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, সরকারি সেবার সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক বিরোধ মীমাংসায় সহায়তা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য প্রবীণ ব্যক্তি, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, দলের নির্বাচনি ইশতেহারে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সরকার গঠনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক, সন্ত্রাস, চুরি ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য বেগম সেলিমা রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা আবার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি অঙ্গীকারবদ্ধ। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচির মতো গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করাও সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হবে।
তিনি বলেন, গ্রাম সরকারে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পাশাপাশি দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গণমাধ্যমকে বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে গ্রাম সরকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন- এমন ব্যক্তিদের মধ্যে অল্পসংখ্যক এখনো জীবিত আছেন। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন গ্রাম সরকারের সদস্যদের পরিচিতিমূলক সভা বা দিকনির্দেশনামূলক কার্যক্রম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রাম পর্যায়ে দলের নতুন নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও এ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। দেশের জন্য কাজ করতে আগ্রহী, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
যেভাবে গঠিত হবে গ্রাম সরকার
প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার থাকবে। এতে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৫ জন সাধারণ সদস্য থাকবেন। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য গ্রাম সরকারের প্রধান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
১৫ জন সাধারণ সদস্যের মধ্যে থাকবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুজন সদস্য- একজন পুরুষ ও একজন নারী-এবং দুজন কৃষক। এ ছাড়া নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য, পল্লিচিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমিক, যুব প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি (এ ধরনের জনগোষ্ঠী থাকলে) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি পাওয়া না গেলে গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবকের সংখ্যা বাড়িয়ে সদস্যপদ পূরণ করা হবে। সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কমপক্ষে ১০ শতাংশ ভোটারের ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের বিধান রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে সদস্য নির্বাচনের এই পদ্ধতি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, ভোটের আয়োজন ও ফল নির্ধারণের দায়িত্ব কার ওপর থাকবে এবং বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া কী হবে- এসব বিষয়ে চূড়ান্ত আইনে স্পষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মেয়াদ পাঁচ বছর, থাকবে নিয়মিত সভার বিধান
খসড়ায় গ্রাম সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমবার গ্রাম সরকার গঠনের তারিখ সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্ধারণ করবে। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নতুন গ্রাম সরকার গঠনের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে। কোনো গ্রাম সরকার বাতিল হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
গ্রাম সরকার গঠনের পর সদস্যদের ৩০ দিনের মধ্যে শপথ নেওয়ার বিধান রয়েছে। মোট সদস্যের এক-তৃতীয়াংশের উপস্থিতিতে সভার কোরাম পূর্ণ হবে। প্রধানের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে কোনো সদস্য পদ ছাড়তে পারবেন। খসড়া অনুযায়ী, পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ শূন্য হবে। অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেও সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার বিধান রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোতে প্রতিটি ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী কোনো হাটবাজার বা এলাকায় গ্রাম সরকারের কার্যালয় স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
উন্নয়ন ও সামাজিক প্রতিরোধে দায়িত্ব
গ্রাম সরকারের অন্যতম কাজ হবে গ্রামের রাস্তা ও কালভার্ট উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণে পরিকল্পনা তৈরি করা। চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দায়িত্বও থাকবে এ সংস্থার।
নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করবে গ্রাম সরকার। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়তা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার কার্যক্রমেও ভূমিকা রাখার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া কৃষি উপকরণের সংকট সম্পর্কে ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা, গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করার দায়িত্ব প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড বিতরণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহে সহায়তার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভিজিএফ ও ভিজিডি কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতার দায়িত্ব থাকবে গ্রাম সরকারের।
জিয়াউর রহমানের আমলে যেভাবে শুরু
গ্রামীণ জনগণকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, গণশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসায় জনগণকে সম্পৃক্ত করাই ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
তৎকালীন উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গ্রামে গ্রাম সরকার গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর এ ব্যবস্থার কার্যক্রম দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ফেরার পর গ্রাম সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলে এ বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০০৩’ প্রণয়ন করা হয়। ওই আইনে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৩ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের বিধান ছিল। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য প্রধান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য উপদেষ্টা হতেন। অন্য সদস্যদের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা থেকে মনোনয়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
তবে আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হলে ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট আইনটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালে গ্রাম সরকার আইন রহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে আইনটি বাতিল করা হয়।
পুরোনো কাঠামো থেকে নতুন প্রস্তাব
জিয়াউর রহমানের আমলের গ্রাম সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত কাঠামোর কিছু মিল থাকলেও সদস্যসংখ্যা ও গঠনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের ব্যবস্থায় প্রধানসহ ১৪ জনের কাঠামোর কথা উল্লেখ থাকলেও ২০০৩ সালের আইনে প্রধান ও উপদেষ্টার পাশাপাশি ১৩ জন সাধারণ সদস্য রাখার বিধান ছিল। নতুন খসড়ায় সাধারণ সদস্যের সংখ্যা ১৫ জন করার প্রস্তাব রয়েছে; ফলে প্রধান ও উপদেষ্টাসহ মোট সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে ১৭।
প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্ত হলে গ্রাম সরকার স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে কাজ করবে, ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে এর দায়িত্বের সমন্বয় কীভাবে হবে এবং সদস্য নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে-এসব বিষয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।