প্রকাশিত : ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৫৬ (বৃহস্পতিবার)
‘বাবা, আমাকে নিয়ে যাও’, শেষ ভিডিও কলে আকুতি বর্ষার

ছবি: সংগৃহীত

রাত তখন প্রায় ১২টা। স্বামীর নির্যাতন আর সহ্য করতে পারছিলেন না ২৪ বছর বয়সী জুমরাতুন নেছা বর্ষা। কাঁদতে কাঁদতে বাবাকে ভিডিও কল করে বলছিলেন, তাঁকে যেন ওই বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। না হলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে-এমন আশঙ্কার কথাও জানান তিনি। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ভিডিও কল। মেয়ের খোঁজ নিতে ছুটে গিয়ে মা–বাবা দেখলেন, বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স। কিছুক্ষণ পর হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারলেন, তাঁদের মেয়ে আর বেঁচে নেই।

গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে রাজধানীর মণিপুরিপাড়ার একটি বাসায় এ ঘটনা ঘটে। বর্ষার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় বর্ষার স্বামী নাবিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত চলছে।

বর্ষার চাচা শেখ জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ভালোবেসে প্রায় এক বছর আগে বর্ষা ও নাবিদের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় শ্বশুরের কাছে টাকা চাইতেন নাবিদ। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। বর্ষাকে মারধরও করা হতো। এর আগে একবার মারধরের শিকার হয়ে তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। তবে এসব ঘটনার কথা পরিবারের সদস্যদের সব সময় জানাতেন না বর্ষা।

স্বজনদের অভিযোগ, ব্যবসা ও মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য বর্ষাকে চাপ দিতেন নাবিদ। বর্ষার বাবা কয়েকবার টাকা দিলেও পরে তা দেওয়া বন্ধ করে দেন। তাঁদের অভিযোগ, নাবিদ ওই টাকা দিয়ে মাদক সেবন করতেন। এরপর থেকে বর্ষার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে।

ঘটনার রাতেও টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বর্ষাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর চাচা। তাঁর ভাষ্য, শ্বশুরবাড়ির একজন ওই মারধরের দৃশ্য ধারণ করে বর্ষার পরিবারের কাছে পাঠান। নির্যাতনের শিকার হয়ে রাত ১২টার দিকে বাবাকে ভিডিও কল করেন বর্ষা। কান্নাকাটি করে বারবার তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান।

একপর্যায়ে কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর মেয়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে না পেরে মা–বাবা তাঁর বাসার উদ্দেশে রওনা হন।

শেখ জাকির হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১২টার দিকে বর্ষার মা–বাবা মণিপুরিপাড়ার বাসাটির সামনে পৌঁছে একটি অ্যাম্বুলেন্স দেখতে পান। তাঁরা বর্ষার শ্বশুরের কাছে জানতে চাইলে বলা হয়, বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন এবং তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

মেয়ের কী হয়েছে, তা তখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেননি তাঁরা। দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বর্ষাকে নামানোর সময় মা–বাবা তাঁকে ডাকাডাকি করতে থাকেন। পরে হাসপাতালের নার্সরা পরীক্ষা করে জানান, বর্ষা আর বেঁচে নেই।

যে মেয়েটি কিছুক্ষণ আগেও বাবাকে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর খবরই শেষ পর্যন্ত শুনতে হলো পরিবারকে।

তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান বলেন, যৌতুকের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে বর্ষাকে মারধর করতেন তাঁর স্বামী নাবিদ হোসাইন। বর্ষার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। পরে হাসপাতাল থেকে নাবিদকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।