মঞ্জু বিজয় চৌধুরী ও মো. এহসানুল হক।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ এবং তথ্য অধিকার আইনে ১১টি বিষয়ে তথ্য চাওয়ার পর এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।
মামলার আসামি সাংবাদিক মো. এহসানুল হক (এহসান বিন মুজাহির) দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলা স্টাফ রিপোর্টার এবং শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম সদস্য সচিব।
গত ২৫ অক্টোবর সিলেট সাইবার সিকিউরিটি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সদ্য বদলিকৃত সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিন। তিনি বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সাংবাদিক এহসানুল হকের ভাষ্য, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে রয়েছে-‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহ’, ‘সরকারি হাসপাতালে রাতেও উড়ে জাতীয় পতাকা’, ‘শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, সচেতনমহলে ক্ষোভ’, ‘জেনারেটর-আইপিএস অচল, মোমবাতিই ভরসা শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে’ এবং ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে বিতর্ক’।
তিনি জানান, হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা যাচাই করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় ১১টি বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আবেদনে বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্যাথলজি ও ভর্তি রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা ফির সরকারি চালানের অনুলিপি, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও দরপত্রসংক্রান্ত তথ্য, জ্বালানি খরচ, সেবাগ্রহীতার সংখ্যা, বাড়িভাড়া জমার হিসাব, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা এবং আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়।
এহসানুল হকের দাবি, সংবাদ প্রকাশ ও তথ্য চেয়ে আবেদন করার কারণেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ এনেছেন। এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে এহসানুল হক বলেন, ‘চাঁদা দাবি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ হাস্যকর ও অবাস্তব। এর বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। হামলা, মামলা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে আমার বস্তুনিষ্ঠ কলম থামানো যাবে না। সিআইডি, পিবিআই এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতি বিনীত অনুরোধ, বিষয়টি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক।’
আদালত ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, মানহানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে দৈনিক জনবাণীর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মঞ্জু বিজয় চৌধুরীকে। দ্বিতীয় আসামি বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের নেতা মোজাহিদুল ইসলাম, তৃতীয় আসামি সাংবাদিক মো. এহসানুল হক। এ ছাড়া চতুর্থ আসামি হিসেবে ‘জেন জেড শ্রীমঙ্গল’ এবং পঞ্চম আসামি হিসেবে প্রবাসী আমির আলীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন বেনামি ও মিথ্যা আইডি ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসা রটিয়েছেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট মুছে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করেছেন। সাইবার সুরক্ষা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলাটি দায়ের করে পুলিশ বা সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।
তবে মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অপর দুই আসামি মঞ্জু বিজয় চৌধুরী ও মোজাহিদুল ইসলাম। তাঁদের দাবি, হাসপাতালের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা সঠিক তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজের প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি আড়াল করতেই তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করেছেন বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
তাঁরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শ্রীমঙ্গল ও পূর্ববর্তী কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে কথিত অনিয়ম-দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার, চাকরিবিধি লঙ্ঘন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁরা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ চর্চা নিশ্চিত করতে মামলাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।