ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধের ময়দানে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ থামছেই না। ইউক্রেনের একটি মানবিক সহায়তা কেন্দ্রে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। হামলার সময় সেখানে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিতে জড়ো হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান চলছে। এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি মানবিক সহায়তা কেন্দ্রে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার (২ নভেম্বর) কোমিশুভাখা গ্রামের একটি স্কুল ভবনে এ হামলা হয়। ভবনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও যুদ্ধের কারণে বন্ধ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এটি মানবিক সহায়তা বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্ধারকর্মী ও পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। এদিকে নতুন করে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেবে। খবর আল জাজিরার।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সম্মুখসারির কাছাকাছি হওয়ায় কোমিশুভাখা গ্রামের স্কুলটি শিক্ষার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল। তবে ভবনটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রতি সপ্তাহের সোমবার সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবারও সহায়তা নিতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন গ্রামের বাসিন্দারা। এ সময় রুশ বাহিনী প্রথমে কয়েকটি বোমা ফেলে। পরে আশ্রয়কেন্দ্রে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়।
রাতের ভাষণে এ হামলাকে ‘ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলা’ বলে আখ্যা দেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
দেশটির জরুরি পরিষেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী ও চারজন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। আহত পাঁচজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী।
জাপোরিঝঝিয়া সিটি কাউন্সিলের সচিব রেজিনা খারচেঙ্কো জানিয়েছেন, ২৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখছেন পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দাবি, গ্রামের বাসিন্দারা প্রতি সপ্তাহে ওই কেন্দ্রে মানবিক সহায়তা নিতে আসেন। ফলে কেন্দ্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে রুশ বাহিনীর অজানা থাকার কথা নয়।
জেলেনস্কি বলেন, এ হামলা প্রমাণ করে রাশিয়া উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী নয়। যুদ্ধের অবসান কিংবা প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিও মস্কোর কোনো আগ্রহ নেই।
গত সপ্তাহে দক্ষিণাঞ্চলীয় অবরুদ্ধ শহর ওলেশকিতে একটি মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় উদ্যোগটি সম্ভব হয়েছিল বলে জানান জেলেনস্কি।
তাঁর মতে, ওই ঘটনার পর মানবিক পদক্ষেপ আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল। ইউক্রেনও এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া তা গ্রহণ না করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি ও সরবরাহ অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে দাবি করেছেন জেলেনস্কি।
ইউক্রেনের গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়কে কাজে লাগিয়ে হামলা চালাতে পারে রাশিয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে থাকার সুযোগ নিতে পারে মস্কো। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে যুদ্ধ শেষ করা ছাড়া মস্কোর সামনে আর কোনো বিকল্প না থাকে।
যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন করে প্রাণহানির কয়েক ঘণ্টা পরই শান্তি আলোচনার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
তিনি জানিয়েছেন, আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসবেন। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নেবে।
উইটকফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনায় কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা চুক্তি, উত্তেজনা প্রশমন, মানবিক পদক্ষেপ এবং যুদ্ধের অবসান।
এর আগে দুই সপ্তাহ আগে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন উইটকফ। ওই বৈঠকের পর নতুন দফার ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় সম্মতি দেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
সাড়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে অগ্রগতি চায় যুক্তরাষ্ট্র। শীত আসার আগেই দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনতে চেষ্টা করছেন মার্কিন আলোচকেরা।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ আলোচনা হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে সেই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া থেমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সোমবার ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ হামলার খবর পাওয়া গেছে।
পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে ড্রোন হামলায় ১২ জন আহত হয়েছেন। দেশটির জরুরি পরিষেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া গ্রিনহাউস ও কয়েকটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরনগরী ওদেসায় একটি গুদামে হামলায় আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। আশপাশের কয়েকটি বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর ইউক্রেনের ২১২টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তাদের বাহিনী।
রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের গভর্নর ভিয়াচেস্লাভ ফেদোরিশচেভও সেখানে হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে হামলা ঠেকানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাননি তিনি।
ইউক্রেনের একাধিক অঞ্চলে হামলা, পাল্টা হামলার আশঙ্কা এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির মধ্যেই নতুন করে আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেন।