ছবি: সংগৃহীত
রাতের আঁধারে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন আর পিয়াইন নদীর ভাঙনে অস্তিত্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছে সিলেটের জাফলংয়ের প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন শ্রীশ্রী কালীবাড়ি মন্দির। একসময় পাহাড়, বাগান ও পাথরের প্রাচীরঘেরা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন চারপাশে গভীর গর্তের কারণে বিচ্ছিন্ন টিলায় পরিণত হয়েছে। মন্দিরে যাতায়াতের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন বর্ষায় মন্দিরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ৩ নম্বর পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের ছৈলাখেল তৃতীয় খণ্ডের বল্লাপুঞ্জী সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই মন্দিরটি স্থানীয়ভাবে রাজবাড়ী মন্দির নামেও পরিচিত। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র উপাসনালয়। পাশাপাশি জাফলংয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছেও এটি একটি পরিচিত দর্শনীয় স্থান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১ নম্বর খতিয়ানের ২৭ নম্বর দাগে ১৬ শতক জমির ওপর মন্দিরটি অবস্থিত। পাথর টিল্লা মামার বাজার এলাকার নন্দমহনের ছেলে কুঞ্জবিহারী সেবাইতের মাধ্যমে স্থানীয় সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবহারের জন্য জায়গাটি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, আনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের আগে এই অঞ্চলে খাসিয়া মালনিয়াং রাজবংশের শাসন ছিল। মেঘালয় সীমান্তসংলগ্ন পান-সুপারির বাগানঘেরা এই এলাকায় জুমে নিয়াং ও মাইলং রাজাদের আমলের রাজপ্রাসাদ ও উপাসনালয়ের পাথরের দেয়াল, ফটকসহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনো টিকে আছে। স্থানীয়ভাবে জায়গাটি জাফলং রাজবাড়ি বা খাসিয়া রাজবাড়ি নামে পরিচিত। তবে স্থাপনাটি মূলত প্রাচীন শ্রীশ্রী কালীবাড়ি মন্দির। চারপাশের বিশাল পাথরের প্রাচীর ও ফটকের কারণে অনেকে একে রাজবাড়ি বলে মনে করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে বল্লাঘাট এলাকার জুম পাহাড়ের পাদদেশে রাতের আঁধারে একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করে আসছে। মন্দিরের চারপাশ থেকে মাটি ও পাথর তুলে নেওয়ায় টিলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে বিশাল গভীর গর্ত। পিয়াইন নদীর ভাঙনও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
বর্তমানে মন্দিরে যাওয়ার স্বাভাবিক কোনো পথ নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, চারপাশের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি টিলার ওপর স্থাপনাটি কোনোমতে টিকে আছে। শুধু মন্দির নয়, অবৈধ উত্তোলনের কারণে আশপাশের বাগান, ফসলি জমি ও প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শনও হুমকির মুখে পড়েছে।
মামার বাজার পাথর টিল্লা কালী মন্দির পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি অংশু গোস্বামী বলেন, ‘রাতের আঁধারে যন্ত্রদানব দিয়ে যেভাবে পাথর ও মাটি সরানো হয়েছে, তাতে আমাদের এই পবিত্র স্থানটির পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও পাথরখেকো চক্র সুযোগ পেলেই আবার খনন শুরু করে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ বা প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ না করলে আগামী বর্ষায় মন্দিরটি আর রক্ষা করা যাবে না।’
ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ও আশপাশের ফসলি জমি রক্ষায় কাজ করছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, সিলেট বিভাগের মধ্যে গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা প্রত্নসম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই দুই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, গোয়াইনঘাটের পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত জুম নামে পরিচিত এই স্থাপনাটিও এখন ধ্বংসের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের ফলে এলাকাটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন স্থাপনাটি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, অবিলম্বে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশ রক্ষা করা হোক এবং এই সম্পদ ধ্বংসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, জাফলংয়ের জুমপাড় এলাকায় অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক মন্দিরটি রক্ষায় প্রশাসন আন্তরিক। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও আশপাশের ফসলি জমি রক্ষায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্দিরটি সুরক্ষায় দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান নয়, মন্দিরের চারপাশে অবৈধ খনন স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় শত শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি হারিয়ে যেতে পারে চিরতরে।