ছবি: সংগৃহীত
এক টাকা! যে টাকায় এখন আর চকলেটও ঠিকমতো মেলে না, সেই এক টাকা জরিমানা দিতেই যেতে হচ্ছে ব্যাংকে। তাও আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের শীর্ষ বিদ্যাপীঠে। প্রযুক্তির যুগে যখন টাকা পাঠানো যায় মুহূর্তেই, তখন এক টাকা জমা দিতে ব্যাংকের দরজায় হাজির হওয়ার এই নিয়ম যেন সময়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত লুকোচুরি!
ঘটনাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান পাঠাগারের। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাবিলা হক বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরি করায় তাঁর জরিমানা হয়েছে মাত্র এক টাকা। কিন্তু সেই এক টাকা পরিশোধের নিয়ম শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠতে পারে। জরিমানার টাকা জমা দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকার জনতা ব্যাংকের শাখায়।
এক টাকা জরিমানা; কিন্তু তা জমা দিতে ব্যাংক পর্যন্ত যাত্রা! টাকার অঙ্ক ছোট হলেও নিয়মের আয়োজন বেশ বড়।
নাবিলা জানান, পূজার ছুটির আগে তিনি বিজ্ঞান পাঠাগার থেকে বই নিয়েছিলেন। বই ফেরত দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২২ তারিখ। কিন্তু ৩ তারিখে বই জমা দিতে যাওয়ায় ২২ তারিখ থেকে হিসাব করে তাঁর ওপর এক টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়।
নাবিলার হল কাছাকাছি হওয়ায় তাঁকে খুব একটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। তবে তাঁর প্রশ্ন, অন্য কোনো হলে থাকলে ব্যাংকে গিয়ে এই এক টাকা জমা দিতে আরও কতটা পথ পাড়ি দিতে হতো!
বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে সামনে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার এক পুরোনো নিয়ম। জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের অধীন বিজ্ঞান পাঠাগারে দীর্ঘদিন ধরেই জরিমানার টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান চালু রয়েছে।
সবচেয়ে মজার বিষয়, নিয়মটি নতুন নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার পরিচালক অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল জানিয়েছেন, কাগজপত্র ঘেঁটে তিনি জানতে পেরেছেন, এই নিয়ম ১৯৭৫ সাল কিংবা তারও আগে, স্বাধীনতার আগের সময় থেকে চলে আসছে।
তবে পরিচালকের নিজেরও জানা ছিল না, জরিমানা মাত্র এক টাকা হলেও ব্যাংকে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আসন্ন লাইব্রেরি কমিটির সভায় আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। সামান্য এই অর্থ অনলাইনে জমা নেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে।
এদিকে এক টাকার নোট এখন সাধারণ লেনদেনে প্রায় হারিয়েই গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের নতুন নোটের তালিকাতেও ছিল না এক টাকার নোট। তবে এক টাকার ধাতব মুদ্রা এখনো চালু রয়েছে। ফলে জরিমানা আদায়ে এক টাকার অস্তিত্ব থাকলেও তা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি যেন এখনো পুরোনো আমলের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে।
বই দেরিতে ফেরত দিলে জরিমানা হবে, সেটি স্বাভাবিক। বই হারালে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়মও থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এক টাকা আদায়ের জন্য ব্যাংকে যেতে হবে; এমন নিয়ম ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবতায় কিছুটা হাস্যরসের জন্ম দিতেই পারে।
একদিকে অনলাইন ভর্তি, ডিজিটাল পেমেন্ট, স্মার্ট ক্যাম্পাসের নানা উদ্যোগ; অন্যদিকে এক টাকা জমা দিতে ব্যাংকের কাউন্টারে হাজিরা। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, বদলায়নি শুধু জরিমানা আদায়ের পুরোনো কায়দা!
শেষ পর্যন্ত আশার কথা, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নতুন করে ভাবছে। হয়তো একদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক টাকা জরিমানা দিতে আর ব্যাংকের পথে হাঁটতে হবে না। মোবাইলেই সেরে যাবে কাজ।