ছবি: সংগৃহীত
কখনো কখনো একটি ইনিংস কেবল স্কোরবোর্ডের কিছু সংখ্যা হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে সাহস, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস আর হার না মানা মানসিকতার এক অনন্য উপাখ্যান। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তেমনই এক মহাকাব্য রচনা করলেন তাওহীদ হৃদয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একাই যেন গড়ে তুললেন রানের প্রাসাদ। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে রূপ দিলেন ডাবল সেঞ্চুরিতে। ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে ভেঙে দিলেন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড।
সিলেটের সবুজ গালিচায় সেদিন শুধু ক্রিকেট খেলা হয়নি, রচিত হয়েছে এক তরুণের বীরত্বগাথা। প্রতিপক্ষের বোলারদের একের পর এক আক্রমণ, সতীর্থদের বিদায় আর স্কোরবোর্ডে উইকেট পতনের মিছিল; কোনো কিছুই টলাতে পারেনি হৃদয়কে। বরং প্রতিটি পতনের পর আরও দৃঢ় হয়েছে তাঁর প্রত্যয়, আরও শাণিত হয়েছে ব্যাটের ভাষা।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মাত্র ২২ রানে হারায় দুই উইকেট। তখন দলের প্রয়োজন ছিল একজন নির্ভরযোগ্য যোদ্ধার, যিনি প্রতিকূলতার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবেন। সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন হৃদয়।
এক প্রান্তে যখন উইকেটের পতন, অন্য প্রান্তে তখন অবিচল এক হৃদয়। মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ; এক এক করে সাজঘরে ফিরেছেন সতীর্থরা। কিন্তু থামেনি হৃদয়ের ব্যাট। তাঁর চোখে তখন একটাই লক্ষ্য, দলকে বিপদমুক্ত করা।
প্রথমে ১০৯ বলে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ফিফটি। এরপর ১৭১ বলে পূর্ণ করেন প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। কিন্তু শতকের আনন্দে আত্মহারা হননি তিনি। বরং সেঞ্চুরিকে আরও বড় ক্যানভাসে আঁকার নেশায় মেতে ওঠেন এই তরুণ। কখনো রক্ষণাত্মক ব্যাটিং, কখনো দৃষ্টিনন্দন শট; ব্যাট হাতে যেন ক্রিকেটের এক অনন্য শিল্পী হয়ে ওঠেন তিনি।
তৃতীয় দিনের সকালে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ব্যাটিং শুরু করা হৃদয়কে সঙ্গ দিতে পারেননি অভিজ্ঞ এই ব্যাটারও। দিনের প্রথম সেশনেই মুশফিক ও লিটনকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে আবারও চাপে ফেলেন জোমেল ওয়ারিক্যান। এরপর একে একে বিদায় নেন মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। তবুও হৃদয়ের চোখে ছিল না হতাশার ছাপ।
এ সময় তাঁর পাশে দাঁড়ান তাইজুল ইসলাম। অষ্টম উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১১৭ রানের দুর্দান্ত জুটি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে অষ্টম উইকেটে এটি অন্যতম সেরা জুটিগুলোর একটি। তাইজুল ২২ রান করে স্টাম্পড হয়ে ফিরে গেলেও হৃদয়ের লড়াই থামেনি। বরং শেষের দিকের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে নিয়ে একাই টেনে নিয়ে যান দলের ইনিংস।
রোস্টন চেইসের এক ওভারে দুটি ছক্কা হাঁকিয়ে বুঝিয়ে দেন, তিনি শুধু টিকে থাকার জন্য ব্যাট করছেন না; ইতিহাস গড়ার জন্যই যেন ক্রিজে দাঁড়িয়ে আছেন। শামার জোসেফ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্য বোলারদের বিপক্ষেও দেখিয়েছেন অসাধারণ সাহস ও দক্ষতা। এমনকি পাঁজরে বলের আঘাত পাওয়ার পরও ব্যাটিং চালিয়ে গেছেন। শরীরের যন্ত্রণা হার মেনেছে তাঁর মনের দৃঢ়তার কাছে।
দেড়শ রান পূর্ণ করার পরই সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড নিজের করে নেন হৃদয়। ছাড়িয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ডও।
এরপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিকেলে জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে মিড অনে ঠেলে দিয়ে সিঙ্গেল নিতেই পূর্ণ হয় হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি। ৩০৪ বলে ২০০! বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিলেন তিনি।
বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ ব্যাটসম্যান হলেন হৃদয়। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। তবে হৃদয়ের কীর্তির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়; প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিতেই দ্বিশতকের স্বাদ!
ডাবল সেঞ্চুরির পরও যেন ক্ষুধা মেটেনি তাঁর। পরের ওভারে বিশপের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে ছাড়িয়ে যান তামিম ইকবালকে। টেস্টের এক ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও এখন হৃদয়ের দখলে। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৮টি ছক্কা। ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে তামিমের করা ৭ ছক্কার রেকর্ড পেছনে পড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত ৩৫৯ বল মোকাবিলা করে ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন তাওহীদ হৃদয়। তাঁর ব্যাটে ভর করেই ৩৫৬ রানের জবাবে বাংলাদেশ অলআউট হয় ৩৮৬ রানে। প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের লিড দাঁড়ায় ৩০ রান।
এই ২৪২ কেবল একটি ব্যক্তিগত ইনিংস নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের দীর্ঘদিনের রেকর্ড পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন হৃদয়। সিলেটের মাটিতে নিজের নাম লিখিয়েছেন ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায়।
ক্রিকেটে অনেকেই আসে, রান করে, রেকর্ড গড়ে। কিন্তু কিছু ইনিংস সময়ের সীমানা পেরিয়ে কিংবদন্তির গল্প হয়ে থাকে। যে ইনিংসে থাকে বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করার সাহস, সতীর্থদের হারিয়েও একা এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় এবং শেষ পর্যন্ত অসম্ভবকে সম্ভব করার দৃঢ়তা।
তাওহীদ হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংস তেমনই এক গল্প। এ গল্প শুধু ব্যাট-বলের নয়, এ গল্প বুকভরা স্বপ্নের, অদম্য সাহসের এবং নিজের সামর্থ্যকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার।