ছবি: সংগ্রহ
একটি সাধারণ কিন্তু স্বপ্নময় জীবন ছিল মইনুল ইসলামের। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ছোট্ট সংসার, বিয়ানীবাজার শহরে ফল ও পান সুপারির দোকান চালিয়ে চলতো তাদের দিন। নিজের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে মেয়েকে ডাক্তার আর ছেলেকে আলেম বানানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন নিজের একটি বাড়ি হবে, যেখানে থাকবে না অভাব, সন্তানদের থাকবে একটি নিজের নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু সব স্বপ্ন থমকে গেছে ৫ আগস্ট ২০২৪এ । বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে বিয়ানীবাজার পিএইচজি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গুলিবিদ্ধ হন মইনুল। সিলেট ওসমানী মেডিকেলে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
আজ প্রায় এক বছর হতে চলেছে তাঁর এই আত্মত্যাগের। কিন্তু রেখে যাওয়া পরিবার এখন দিশেহারা। ভাড়া বাসায় বাস, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর বাবাহীন জীবনে প্রতিদিনই একরাশ শূন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে মইনুলের সন্তান ফাতিমা ও শিহাব। ফাতিমা পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে, আর শিহাব ষষ্ঠ শ্রেণিতে।
কান্নাজড়ানো কণ্ঠে ফাতিমা জানায়, বাবা চাইতেন আমি ডাক্তার হয়ে গ্রামের মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিই। আর ভাই শিহাব হবে আলেম। প্রতিদিন বাবার কাছে কলা আর বিস্কুট চাইতাম। ভাই চাইত নতুন জামা। এখন তো কেউ নেই যে আমাদের আবদার রাখবে। নেই সেই স্নেহ, নেই সেই ভরসা'
শিহাব বলল,সেদিন আব্বু বলেছিল, ‘চল, বাপ বেটা একসাথে মিছিলে যাই।’ আমি অর্ধেক পথ থেকে ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু আব্বু আর ফিরে আসেননি।'
স্ত্রী শিরিন বেগম এখন সন্তানদের নিয়েই বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। তিনি বলেন, জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা এবং সিলেট জেলা পরিষদ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। এরপর আর কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। মাসে মাসে বাসাভাড়া, ছেলেমেয়ের পড়ালেখার খরচ, খাবার, সব মিলিয়ে দিন চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকার নাকি শহীদ পরিবারগুলোর জন্য ঘর করে দেওয়ার কথা ভাবছে। যদি আমাদের একটা ঘর হতো, অন্তত মাথার ওপর একটা ছাদ থাকত, তাহলে কিছুটা হলেও শান্তি পেতাম। আমি বেশিদিন বাঁচব না, কিন্তু মরার আগে যদি সন্তানদের একটু নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে যেতে পারি, তাহলে সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।'
আজ ফাতিমা ও শিহাবের একটাই আকুতি, তাদের বাবার স্বপ্ন যেন অসম্পূর্ণ না থাকে। তারা চায়, সরকার ও সমাজের বিবেকবান মানুষরা এগিয়ে আসুক। তাদের পাশে দাঁড়াক। যেন তারা হারানো বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, এই দেশের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবে।