গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্মসূচিতে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এই ঘটনার জন্য সরকারের সতর্কতা ও পরিকল্পনার ঘাটতি এবং উসকানিমূলক বার্তাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় এনসিপির ধারাবাহিক ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি হঠাৎ করে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ নামে রূপ নেওয়ার পর, যার পেছনে গোপন বার্তা ছিল বলে মনে করছেন অনেকে। এরপর মঙ্গলবার রাত থেকেই গুজব ছড়াতে শুরু করে, যা বুধবার সকাল নাগাদ উত্তেজনায় রূপ নেয়।
সংঘাতের ধারাবাহিকতা
বুধবার সকালে এনসিপি নেতারা গাড়িবহর নিয়ে গোপালগঞ্জ শহরে ঢোকার আগেই উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। শহরে ঢোকার পথে পুলিশের গাড়ি ও ইউএনওর গাড়িতে হামলা হয়। বেলা দেড়টার দিকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা মিছিল নিয়ে এসে পৌরপার্কে সমাবেশস্থলে হামলা চালায়। পরে পুলিশ ও এনসিপি নেতাকর্মীরা পাল্টা প্রতিরোধ করলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হয় এবং আহত হয় অনেকে। সেনা ও পুলিশ মোতায়েন সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রথমে ১৪৪ ধারা এবং পরে রাত ৮টা থেকে ১০ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়।
বিশ্লেষকদের বক্তব্য
প্রবিন সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘জুলাই পদযাত্রা’ থেকে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ নামকরণ একটি স্পর্শকাতর এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। সরকার ও এনসিপি উভয়ের পক্ষ থেকেই যথাযথ সতর্কতা থাকলে এই সংঘাত এড়ানো সম্ভব ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘টুঙ্গিপাড়া মাজার ধ্বংসের’ মত উসকানিমূলক মন্তব্য প্রচার পেয়েছে, যা সরকারের পক্ষ থেকে আগেভাগে মোকাবিলা করা উচিত ছিল।’
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, ‘এই ঘটনার পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য আছে কি-না, সেটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।’ তিনি নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই ধরনের সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গোপালগঞ্জে ‘মুজিববাদীরা’ জঙ্গি কায়দায় হামলা চালিয়েছে এবং পুলিশ নির্লিপ্ত থেকেছে। তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী স্বৈরাচার পতনের পরও দুষ্কৃতিকারীরা নতুন করে দেশে নৈরাজ্য তৈরি করছে।’ তিনি দোষীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘গোপালগঞ্জে কার্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে নিরীহ জনতা আক্রান্ত হয়েছে।’ তিনি সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ বলেন, ‘গোপালগঞ্জে প্রক্সি স্টেট তৈরি করে দিল্লি ও হাসিনা মিলে গণতন্ত্রকে ধ্বংসের চক্রান্ত করছে।’
জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, ‘দিল্লির নির্দেশেই এই হামলা হয়েছে, যার মাধ্যমে গোপালগঞ্জে আবার ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে।’
অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, এলডিপি ও গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এনসিপির কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।
গোপালগঞ্জের সংঘাত দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ধরনের পরিস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সরকারের উচিত ছিল আগেভাগে সতর্কতা নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা।
এনসিপির ভাষাগত কৌশল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উসকানি ও সরকারের নির্লিপ্ত অবস্থান মিলিয়ে গোপালগঞ্জের রক্তক্ষয়ী সংঘাত যেন একটি পরিকল্পিত বিপর্যয়ের চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।