২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিট সিনেমা রানঝানা আবারও আলোচনায়, তবে এবার কাহিনির জন্য নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারে সিনেমার সমাপ্তি বদলে দেওয়াকে ঘিরে। মূল নির্মাতা আনন্দ এল রাই এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, আর প্রযোজনা সংস্থা ইরোস ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে সৃজনশীল হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন।
সম্প্রতি ইরোস ঘোষণা দিয়েছে, রানঝানা-র তামিল ডাব সংস্করণ অম্বিকাপথি নতুন করে মুক্তি পাবে আগামী ১ আগস্ট। তবে এবার ট্র্যাজিক ক্লাইম্যাক্স বদলে দেওয়া হয়েছে ধানুশ অভিনীত কুন্দন আর মারা যায় না, বরং সে বেঁচে থাকে। এই পরিবর্তন এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হয়েছে, যা নির্মাতা আনন্দ এল রাইয়ের ঘোর আপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
'নির্মাতার সম্মতি ছাড়াই পরিবর্তন' আনন্দ এল রাইয়ের আপত্তি
প্রখ্যাত বিনোদনমাধ্যম ভ্যারাইটি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাই বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত আমার কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো শিল্পীর সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শুধু দুঃখজনক নয়, বরং শিল্পীর স্বাধীনতার পরিপন্থী।’
রাই আরও বলেন, ‘চলচ্চিত্র কোনো পণ্যমাত্র নয়। এটি নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি, সৃজনশীলতা ও শ্রমের প্রতিফলন। এ ধরনের পরিবর্তন সেই অভিপ্রায়ের সাথেই প্রতারণা।’
ইরোসের দাবি: আইন আমাদের পক্ষেই
উল্টো ইরোস গ্রুপের সিইও প্রদীপ দ্বিবেদী বলছেন, ‘এই সংস্করণটি কোনো নতুন সিনেমা নয়, বরং একটি বিকল্প সমাপ্তি মাত্র। আমাদের চুক্তি অনুযায়ী, প্রযোজকই পূর্ণ অধিকারভুক্ত এবং নির্মাতা তাঁর নৈতিক অধিকার লিখিতভাবে পরিত্যাগ করেছেন।’
তিনি আরও দাবি করেন, এআই ব্যবহারে কাহিনির বিকল্প উপস্থাপন করা আজকের দিনে একটি স্বাভাবিক চর্চা, এবং তারা ভবিষ্যতেও এই ধারা চালিয়ে যেতে চান। যদিও নির্মাতার সম্মতি নেওয়ার বিষয়টি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয় বলেই তারা মনে করেন।
সুপ্রিম কোর্টের নজির: নির্মাতার নৈতিক অধিকার অটুট
তবে ২০২২ সালের এক মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক স্পষ্ট রায় দেয়, চলচ্চিত্র পরিচালকেরা ‘লেখক’ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং তাঁদের নির্দিষ্ট নৈতিক অধিকার থাকবে, তা তারা অর্থনৈতিক অধিকার হস্তান্তর করলেও।
এই প্রেক্ষাপটেই আনন্দ এল রাই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই সিদ্ধান্ত কি ভবিষ্যতের নির্মাতাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে? আমরা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সৃজনশীলতার মর্যাদা রক্ষা করব, নাকি প্রযুক্তির ছলে শিল্পকে বদলে যেতে দেব?’
বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বও নেপথ্যে
এই বিতর্কের আড়ালে রয়েছে আরও একটি করপোরেট দ্বন্দ্ব। ইরোসের পক্ষ থেকে রাইয়ের প্রযোজনা সংস্থা কালার ইয়েলো প্রোডাকশনের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ আর্থিক লেনদেন’ ও ‘বোর্ড অনুমোদন ছাড়া চুক্তি’ করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও রাই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ‘সেই ব্যবসায়িক বিরোধ এই সৃজনশীল সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত নয়। এআই ব্যবহার করে পরিণতি বদলানো একেবারেই অন্য প্রসঙ্গ, এবং তা গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
এআই বনাম শিল্পী: ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করে এই বিতর্ক?
সিনেমার সমাপ্তি পরিবর্তনের এ ঘটনা কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এআই প্রযুক্তি ও সৃজনশীল অধিকারের এক জটিল বিতর্ককে সামনে এনে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রযুক্তির দাপটে কি নির্মাতার কণ্ঠ হারিয়ে যাবে? নাকি তৈরি হবে একটি নতুন ভারসাম্য, যেখানে সৃজনশীলতা ও আধুনিকতা পাশাপাশি চলবে?