প্রকাশিত : ৩১ জুলাই, ২০২৫ ১৪:৩০ (মঙ্গলবার)
বিয়ানীবাজারে বৈধ অস্ত্র জমা, তবুও অবৈধ অস্ত্রের ভীতি তাড়া করছে জনমনে

ছবি: সংগ্রহ

সিলেটের বিয়ানীবাজার থানায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছেন মালিকরা। থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি নির্দেশনার আলোকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৬ বছরে যেসব বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছিল, সেগুলো গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে যথাযথভাবে জমা দেন অস্ত্রধারীরা। বিষয়টি বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিশ্চিত করেছেন।

ওসি বলেন, অস্ত্রধারীরা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের অস্ত্র থানায় জমা দিয়েছেন। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের সময় থানা থেকে খোয়া যাওয়া দুটি অস্ত্রের একটি এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

থানা সূত্রে জানা যায়, এর আগে থেকেই থানায় ৪২টি অস্ত্র জমা ছিল। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বাকি অস্ত্রগুলোও মালিকরা জমা দেন। বর্তমানে বিয়ানীবাজারে বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ১৬১টি।

তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও ব্যক্তিগত বিরোধে এসব অস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যায়। বিশেষ করে বিগত  সরকারের শাসনামলে লাইসেন্সধারী এবং অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত চারখাইয়ের চিনিকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এখনও পর্যন্ত সেসব অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি প্রশাসন।

সহিংস অতীত ও অস্ত্রের ছায়া
বিগত বছরগুলোতে বিয়ানীবাজারে একাধিক প্রাণঘাতী ঘটনার পেছনে অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে।

২০১৭ সালের ১৭ জুলাই বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শ্রেণিকক্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ছাত্র খালেদ আহমদ লিটু (২৩)।

পৌর শহরের দক্ষিণ বাজারে সিএনজি স্ট্যান্ড দখল নিয়ে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সবজি ব্যবসায়ী নিজু মিয়া।

কালাইউরায় সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তৎকালীন ওসি সৈয়দ মোনায়েমুল ইসলাম (৩১ আগস্ট ২০১৯)।

একই রাতে শেওলা সেতুর কাছে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হন মিসবাহ উদ্দিন, উদ্ধার হয় একটি পাইপগান।

২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর মাথিউরার একটি বাড়ি থেকে ৭ রাউন্ড গুলিসহ দুটি রিভলবার ও অনেক রামদা উদ্ধার করে পুলিশ।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আশরাফুল ইসলামের ছেলে নাবিল আশরাফ অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন।

এছাড়া কোনাগ্রামে আপন ভাইয়ের লাইসেন্সধারী বন্দুকের গুলিতে নিহত হন অপর ভাই।

বাতিল হতে পারে অর্ধশত অস্ত্রের লাইসেন্স
সরকার পরিবর্তনের পর বিয়ানীবাজারে অবৈধ অস্ত্রের অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করে আসছে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। দল দুটির পক্ষ থেকে এসব অস্ত্র উদ্ধারে দ্রুত কার্যক্রম শুরুর দাবিও জানানো হয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিয়ানীবাজারে যেসব অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে প্রায় অর্ধশত লাইসেন্স বাতিলের চিন্তা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে জমা পড়া অস্ত্রগুলোর কাগজপত্র যাচাই করে অনিয়ম ধরা পড়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কে কতোটা অস্ত্রধারী?
বিয়ানীবাজারে বৈধ অস্ত্রধারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী। এরপর রয়েছেন রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা। তৃতীয় স্থানে আছেন ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য পেশার মানুষ।

গত দেড় দশকে বিয়ানীবাজারে বড় কোনো অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। যদিও র‌্যাব ও পুলিশ মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে অস্ত্র উদ্ধার করেছে, তবে তা জনসাধারণকে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

রাজনৈতিক পক্ষগুলোর উদ্বেগ
বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার হোসেন বলেন, ‘বিগত সময়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হাতে অস্ত্র ছিল, তারা প্রকাশ্যে তা ব্যবহার করে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়েছে, নিজেরাও সংঘর্ষে জড়িয়েছে। আমরা চাইযে কোনো অস্ত্র, বৈধ হোক বা অবৈধ, দ্রুত উদ্ধার হোক। নাহলে একটি শান্তিপূর্ণ এলাকা হঠাৎ করে অশান্ত হয়ে উঠতে পারে।’

প্রশাসনের অবস্থান
বিয়ানীবাজার থানার ওসি আশরাফ উজ্জামান বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্র শনাক্ত করে উদ্ধার করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, অস্ত্র উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।”

অস্ত্র জমা দেওয়া হলেও বিয়ানীবাজারে এখনও অবৈধ অস্ত্রের ছায়া রয়ে গেছে, এমন বাস্তবতায় এলাকাবাসী চাইছে কঠোর নজরদারি এবং সুনির্দিষ্ট অভিযান।