প্রকাশিত : ০৩ আগস্ট, ২০২৫ ১২:০১ (মঙ্গলবার)
গ্রিসে হ ত্যা কাণ্ডে র শিকার সুনামগঞ্জের রাজা হোসেন: স্বপ্নভঙ্গে স্তব্ধ পরিবার

ছবি: সংগৃহিত।

সন্তানের স্বপ্নপূরণে সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের আবদুল জলিল। ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে ছেলেকে ইউরোপে পাঠিয়েছিলেন আশায় বুক বেঁধে। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ হলো এক নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। গ্রিসে সহকর্মীদের হাতে খুন হয়েছেন তার ছেলে রাজা হোসেন (২৮)।

নিহত রাজা হোসেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের পূর্বপাড়ার বাসিন্দা। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় এবং চার ভাইয়ের মধ্যে বড়।

রাজা হোসেনের পরিবার জানায়, প্রায় দেড় বছর আগে ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ করে তাকে ইউরোপে পাঠানো হয়। পথে মানবপাচারকারীদের হাতে পড়ে মুক্তিপণ দিতে হয়েছে সাড়ে ১২ লাখ টাকা। পরে ইরান ও তুরস্ক হয়ে তিনি গ্রিসে পৌঁছান। সেখানে প্রথমে একটি কৃষিখামারে কাজ শুরু করেন। পরিবারের ঋণ শোধের লক্ষ্যে রাজা পরিশ্রম করে মাত্র ২ লাখ টাকা দেশে পাঠাতে পেরেছিলেন। বাকি ১৯ লাখ টাকার ঋণ রয়ে গেছে এখনও।

গ্রিসে রাজা কাজ করতেন একই উপজেলার সলফ গ্রামের সেবুল মিয়ার অধীনে। সেবুল দেশে ফেরার সময় রাজার হাতে ফোরম্যানের দায়িত্ব তুলে দেন। এতে ক্ষুব্ধ হন তারই সহকর্মী রফিক আহমেদ, সেজুল হোসেন, রেজাউল করিম, জামাল হোসেন ও রাহুল।

পরিবারের বরাতে জানা যায়, ২৫ জুলাই সকালে মোটরসাইকেলযোগে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন রাজা। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় পেছন থেকে তাকে অতর্কিতে হামলা করে ওই পাঁচজন। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ভিডিও কলে থাকা মহিলা আত্মীয়। তিনদিন পর এক পরিত্যক্ত স্থানে টিন দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পাওয়া যায় রাজার মরদেহ।

রাজা হোসেনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবার ও গ্রামজুড়ে। মা নিবারুন নেছা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। বলছেন, ‘আমার রাজা তো প্রতিদিন একবার হলেও ফোন দিত। সাত দিন হয়ে গেছে, ছেলের কোনো খোঁজ নেই। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।’

বাবা আবদুল জলিল বলেন, ‘সব আশা ছিল ছেলেকে ঘিরে। তাকে বিদেশে পাঠাতে ঋণ করেছি। ভাবছিলাম একদিন ঘর করবো, ভাইবোনদের লেখাপড়া চালাবো। এখন তো সব শেষ। তার লাশটা অন্তত দেশে এনে যেন শেষবার দেখতে পারি। আমি সরকারের সহযোগিতা চাই।’

রাজার চাচা লুৎফর রহমান বলেন, ‘রাজা ছিল নিরীহ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল ছেলে। ফোরম্যান হওয়ার কারণে কিছু লোক ঈর্ষান্বিত হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আমরা এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’

অন্যদিকে অভিযুক্ত রফিক আহমেদের চাচা কাজি আইয়ুব আলী বলেন, ‘রফিক ভীতু প্রকৃতির ছেলে। সে জড়িত কি না, নিশ্চিত না। হয়তো ভয় পেয়ে কোথাও সরে গেছে।’

শান্তিগঞ্জ থানার ওসি আকরাম আলী বলেন, ‘ঘটনাটি যেহেতু গ্রিসে ঘটেছে, সেখানে আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে নিহতের পরিবার যে কোনো সহযোগিতা চাইলে, আমরা পাশে থাকব।’

একজন সম্ভাবনাময় তরুণের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি। এখন প্রশ্ন একটাই-রাজা হোসেনের হত্যার বিচার আদৌ হবে তো?