প্রকাশিত : ০৫ আগস্ট, ২০২৫ ১২:০৫ (মঙ্গলবার)
৫ আগস্টের রক্তাক্ত বিকেল: বিয়ানীবাজারে শোক, স্মৃতি ও বিচারের অপেক্ষা

ছবি: সংগৃহিত।

গত বছরের ৫ আগস্ট বিয়ানীবাজারবাসীর জন্য হয়ে উঠেছিল এক বেদনার দিন। রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে বিকেল গড়াতেই শহরে নেমে আসে ভয়াবহ আতঙ্ক ও শোক। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে দুপুরে পৌর শহরে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন সাধারণ ছাত্র-জনতা। কেউ লাল-সবুজের পতাকা হাতে, কেউ চোখে ভেসে ওঠা এক বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর।কিন্তু এই উল্লাস খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।

আনন্দ যাত্রা পরিণত হয় সহিংসতায়। দুপুরের পর পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হতে থাকে। বিক্ষোভকারীরা উপজেলা প্রশাসন কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়, থানা চত্বরে অগ্নিসংযোগ করে। শুরু হয় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ এবং পরবর্তীতে গুলিবর্ষণ। হঠাৎ গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো পৌর শহর। রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, রক্ত ও কান্না।

গুলিতে প্রাণ হারান তিন তরুণ-তারেক আহমদ (২৪), ময়নুল ইসলাম (৩২) ও কলেজ শিক্ষার্থী রায়হান হোসেন (১৮)। গুলিবিদ্ধ হন আরও অনেকে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দুবাগের নাজমুল ইসলাম তাজিম চৌধুরী। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বারুদের গন্ধ, রাস্তায় পড়ে থাকা রক্তমাখা কাপড় ও জুতা-স্যান্ডেল হয়ে ওঠে বিভীষিকার নীরব সাক্ষী।

নিহতদের পরিবারে এখনও অন্ধকার
শহীদ তারেক আহমদের মা ইনারুন নেসা বলেন, ‘দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল। আমার সন্তানকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব। রাস্তার উপর পড়ে আছে আমার গুলিবিদ্ধ ছেলেটি-এ খবর শুনে এক মায়ের বুকের ভিতর কী ঘটে, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না।’

শহীদ ময়নুল ইসলামের স্ত্রী শিরিন বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কে জানতো বিজয়ের আনন্দই হবে তার শেষ বিদায়! আমার সন্তানরা আজ এতিম। আমাদের কাছে ৫ আগস্ট চিরকাল এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।’

রায়হান উদ্দিনকে দাফন করা হয়েছে তাঁর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তিনি পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকতেন বিয়ানীবাজার পৌরসভার পূর্ব নয়া গ্রামে। ময়নুল ইসলামকে দাফন করা হয়েছে পৌরসভার টিএন্ডটি রোড কবরস্থানে এবং তারেক আহমদকে তাঁর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নিহতদের কারোরই ময়নাতদন্ত হয়নি।

আহত নাজমুল ইসলাম চৌধুরী এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন।

চারটি মামলা, শতাধিক আসামী
৫ আগস্টের ঘটনায় বিয়ানীবাজার থানায় দায়ের হয়েছে ৪টি মামলা-তিনটি হত্যা মামলা এবং একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। এসব মামলায় দেড় শতাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন খান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম পল্লব, বিয়ানীবাজারের পাঁচজন সাংবাদিকসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের অনেকেই এখনো পলাতক। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ উজ্জামান বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের ঘটনায় ৪টি মামলা হয়েছে। যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তে সম্পৃক্ততা মিলেছে, তাঁদের নামই চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে অনেক আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

প্রশাসনের আশ্বাস
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মুস্তাফা মুন্না বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকতে প্রশাসন সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। তাদের সহায়তায় আমরা সবসময় প্রস্তুত।’