ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহীতে ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে রং করা সাধারণ ওষুধ। মাত্র এক টাকার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধে লাল-গোলাপি রং লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইয়াবার আদল। এরপর মাদকসেবীদের কাছে প্রতি পিস ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। না জেনে এসব ওষুধ সেবন করে কেউ কেউ শারীরিক সমস্যায় পড়ছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ওষুধ সেবন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজশাহী মহানগরীর আইডি বাগানপাড়া রেললাইন এলাকা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা চলে। মাদকসেবীদের আনাগোনাও দেখা যায় নিয়মিত।
শুধু আইডি বাগানপাড়া নয়, নগরীর চন্দ্রিমা থানার বারো রাস্তা, বুধপাড়া, কোট ঢালান, গুড়িপাড়া, রাজশাহী নিউমার্কেট ও হরিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কৌশলে ইয়াবা এবং ইয়াবার আদলে তৈরি রং করা ওষুধ বিক্রির চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব চক্র প্রকৃত মাদকের পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ‘মায়াপিল’ ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ ‘ডুরালাক্স’ রং করে ইয়াবার মতো সাজিয়ে বিক্রি করছে। বিশেষ করে কম দামে ইয়াবা পাওয়ার আশায় আসা মাদকসেবীদের টার্গেট করেই এসব বড়ি বিক্রি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাধারণ ওষুধের গায়ে লাল বা গোলাপি রঙের মার্কার কিংবা সাইনপেনের কালি লাগিয়ে দেওয়া হয়। এতে দেখতে অনেকটা ইয়াবার মতো হয়ে যায় বড়িগুলো। এরপর সেগুলো প্রকৃত ইয়াবা বলে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
নগরীর আইডি বাগানপাড়ায় রাফিউল ইসলাম নামে এক মাদকসেবীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘন ঘন অভিযানের কারণে অনেকেই এখন সরাসরি ইয়াবা বিক্রি করছে না। এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২৮০ টাকা করে দুই পিস ‘মাল’ কিনেছিলেন তিনি। পরে সেবনের সময় বুঝতে পারেন, সেগুলো ইয়াবা নয়, ওষুধ। তাঁর ভাষ্য, ওই বড়ি খাওয়ার পর পায়খানার বেগ বেড়ে যায়।
সামসুল ইসলাম নামে আরেক মাদকসেবী বলেন, ‘এটা ইয়াবার মতো করে তৈরি করা হয়। আসলে মায়াবড়ি রং করে বিক্রি করা হচ্ছে।’
ইয়াবা নয়, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি
চিকিৎসকদের মতে, মায়াপিল কোনো মাদক নয়। এটি যৌগিক মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। মায়াপিলের সাদা ট্যাবলেটে রয়েছে ইথিনাইল এস্ট্রাডিওল ০.০৩ মিলিগ্রাম ও লেভোনরজেস্ট্রেল ০.১৫ মিলিগ্রাম। আর বাদামি ট্যাবলেটে রয়েছে ফেরাস ফিউমারেট ৭৫ মিলিগ্রাম।
২৮টি বড়ির একটি প্যাকেটে সাধারণত ২১টি হরমোনযুক্ত ট্যাবলেট ও সাতটি আয়রন ট্যাবলেট থাকে। এর মূল উদ্দেশ্য গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা। হরমোনের মাধ্যমে এটি ডিম্বস্ফোটন বন্ধ বা দমন করে এবং জরায়ুমুখের শ্লেষ্মায় পরিবর্তন এনে শুক্রাণুর প্রবেশ কঠিন করে।
অর্থাৎ, যে বড়িটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজনে নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের জন্য তৈরি, সেটিই এখন রং করে ইয়াবা হিসেবে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধও ইয়াবার নামে
আরেকটি ওষুধ ‘ডুরালাক্স ৫ মিলিগ্রাম’। এর কার্যকর উপাদান বিসাকোডিল। এটি স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সেটিভ বা রেচক হিসেবে কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা পরীক্ষা বা কোলন পরীক্ষার আগে অন্ত্র পরিষ্কার করতেও এটি ব্যবহার করা হয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডুরালাক্স অতিরিক্ত বা দীর্ঘদিন সেবন করলে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত ব্যবহারে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
অথচ ইয়াবার বিকল্প হিসেবে মাদকসেবীরা কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়াই এই ওষুধ সেবন করছেন বলে অভিযোগ। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘ইয়াবা একটি মাদকদ্রব্য। কিন্তু ডুরালাক্স ও মায়াবড়ি মাদক নয়। তারপরও এসব ওষুধ রং করে খেলে বা রোগ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে সেবন করলে শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
মাদক ঠেকাতে নতুন কৌশল?
অপরাধ বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পাল বলেন, সস্তা ওষুধ রং করে ইয়াবার আদলে বাজারজাত করার অভিযোগ মাদক ব্যবসার নতুন কৌশলের ইঙ্গিত হতে পারে। প্রকৃত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হলে অসাধু চক্র বিকল্প উপায়ে মাদকসেবীদের চাহিদা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় শুধু মাদক বিক্রির বিষয় নয়, সাধারণ ওষুধের অপব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, ‘শুধু ইয়াবা নয়, সব ধরনের মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মহানগর পুলিশ মাদক বিক্রির আস্তানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেসব জায়গা থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
তবে মায়াবড়ি ও ডুরালাক্স রং করে ইয়াবার আদলে বিক্রির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে জানান।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। মাদককারবারিদের ওষুধ রং করে বিক্রি করা নতুন কৌশল হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে মাদকের বিষয়ে তথ্য দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রাজশাহীতে ইয়াবার নামে সাধারণ ওষুধ বিক্রির এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ওষুধ বিক্রেতা ও মাদককারবারিদের বিষয়ে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অজানা কোনো বড়ি ইয়াবা বা অন্য মাদক ভেবে সেবন না করে এর উৎস ও পরিচয় নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
