শিরোনাম
কলকাতার পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু, আহত ২৫ ইউপি নির্বাচন: চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ২৫ নভেম্বর স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে ছাত্রলীগ নেতার হুমকি, ‘পেনশন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন না’ সিলেটে পৃথক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৩ জনের মৃ/ত্যু: আ হ ত ১০ সিলেট সীমান্তে একসপ্তাহের ব্যবধানে ফের গুলিতে যুবকের মৃ/ত্যু ইনানীর রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, ৬ জনের পরিচয় মিলেছে ‘ভোটব্যাংক নয়, স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সিদ্ধান্ত নিন’: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটে হৃদয় হরিজন হত্যা: নরসিংদী থেকে গ্রেপ্তার ৩ ভারতে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের কৌশল নিয়ে বিতর্ক

https://www.emjanews.com/

19721

opinion

প্রকাশিত

১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৩৯

আপডেট

১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৪০

মতামত

মইনুদ্দিন আহমদ জালাল : একটি ‘দুঃখের পোস্টার’

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০২:৩৯

ছবি: সংগৃহীত

সিলেট ও সুনামগঞ্জকে নদীমাতৃক করে রেখেছে সুরমা। এ নদীর উৎসমুখের একটি স্থান ভারতের টিপাইমুখ। সেখানে বাঁধ নির্মাণের তোড়জোড় চলছিল। বাঁধ হলে দুই দেশের নদীবাহিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ঠেকাতে হবে বাঁধ। সুরমার ক্ষোভ ধারণ করে একে একে রচিত হয় প্রতিবাদী কর্মসূচি। নদীতীরের মানুষকে জাগাতে বরাকের মোহনা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত চলে প্রচারণা। নদীতে পায়রা ওড়ানো, পুষ্পবৃষ্টি, নৌযাত্রা, ‘ক্ষমা করো হে নদী’-এ রকম কতশত কোমল অথচ প্রতিবাদী কর্মসূচি। এসবই ছিল নদীসংগ্রাম। নেপথ্যে ছিলেন একজন-মইনুদ্দিন আহমদ জালাল। তাঁর পঞ্চাশ পেরোনো জীবনের শেষবেলার এই নদীসংগ্রাম যেন তাঁর পুরো জীবনকেই নদীর মতো বহমান করে রেখেছে। আজ ১৮ অক্টোবর ২০২৬, মইনুদ্দিন আহমদ জালালের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর স্মরণও নদীর মতো বহমান।

নদী জীবন্ত সত্তা। নদীরও আছে অধিকার। নদী যেহেতু মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, তাই নদীর অধিকার রক্ষার লড়াইও মানুষেরই লড়াই। নদীকে সামনে রেখে মানুষের জন্য জীবনভর লড়ে যাওয়া এই মানুষটির মূল পরিচয় ছিল যুবরাজনীতিবিদ। সিলেট-সুনামগঞ্জ ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্ত, রাজধানী ঢাকা, এমনকি দেশের সীমানার বাইরেও ছিল তাঁর তৎপরতা। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া-মনে হয়, এই তো সেদিন! আঠারোর সেই তারুণ্যদীপ্ত মানুষের বিদায়-বিষাদের দিনটি পরিচিত মহলে আজও শোক হয়ে বইছে। তরঙ্গহীন নদীর জলে তৈরি করছে অকালপ্রয়াণের ঢেউ।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে বেড়াতে গিয়ে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে। তাঁর আদিনিবাস সিলেট শহরের প্রান্তবর্তী দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুর। হাজি ইছকন্দর আলী ও সিতারা খানমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে মইনুদ্দিন আহমদ জালাল ছিলেন একমাত্র ছেলে। তাঁর বাবা-চাচারা সুনামগঞ্জ শহরে আরেকটি ঠিকানা গড়ে তোলেন। ১৯৬৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর সেখানেই জন্ম মইনুদ্দিন জালালের।

স্কুলছাত্র থাকাকালে প্রগতিশীল শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর তারুণ্যে জ্বলে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে। করতেন ছাত্র ইউনিয়ন। সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল সিলেট ও সুনামগঞ্জজুড়ে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজবন্দীও হয়েছিলেন। ১৯৮৩ সালে এক মাস কারাভোগ করেন সুনামগঞ্জ কারাগারে। এমসি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে সিলেটে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। যুব ইউনিয়নের সিলেট জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন পরপর দুবার। কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। যুবরাজনীতির কল্যাণে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও হয়ে ওঠেন পরিচিত মুখ। পঞ্চাশ পেরোনো জীবনে ৩২টি দেশে যুব উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের ৬২টি দেশ।

একসময় আইনপেশায়ও যুক্ত হন। সুরমা নদীর মতোই তাঁর যোগ ছিল সিলেট ও সুনামগঞ্জ বারের সঙ্গে। তবে পেশায় মনোযোগ ছিল না তেমন। অনেকটা বোহেমিয়ানের মতো পৃথিবী চষে বেড়াতেন। যুব উৎসবের পতাকাতলে দেশ থেকে দেশে ছুটে বেড়াতেন। সেই পরিভ্রমণের শুরু কিউবা থেকে। বিপ্লবী চে গুয়েভারা ও ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ টান। বিশ্ব গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন-ডব্লিউএফডিওয়াই আয়োজিত ১৪তম বিশ্ব ছাত্র ও যুব উৎসবে অংশ নিতে ১৯৯৭ সালে যান কিউবার হাভানায়। এর পেছনে ছিল 

ফিদেল কাস্ত্রোর ঐতিহাসিক উক্তির আকর্ষণ-‘আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি...।’ ফিদেল কাস্ত্রোর হাত স্পর্শ করে যেন সেই উক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতাই জানিয়ে এসেছিলেন। এরপর যুবরাজনীতির পথে তাঁর যাত্রা হয়ে ওঠে আরও গতিময়। একে একে অংশ নেন বিশ্বের বিভিন্ন যুব উৎসবে। আলজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইকুয়েডর ও রাশিয়ায় যুব উৎসবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। ২০০৬ সালে ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রেতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সামাজিক ফোরামে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন।

এ তো গেল দেশের বাইরে দেশে দেশে তাঁর তৎপরতার কথা। নিজভূমে কী করেছিলেন? স্থানীয় অঙ্গনে কতটা নির্মোহ ছিল তাঁর চলাফেরা? দলমত-নির্বিশেষে মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁকে চিত্রিত করে বিরল বিনয়ী ও অনন্য এক মানুষ হিসেবে। মানুষের বিপদে-আপদে তাঁকে পাওয়া যেত খুব সহজেই। স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামে আদর্শিক অবস্থানে অবিচল থাকা, স্রোতের বিপরীতে একা দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া; এই ছিল মইনুদ্দিন আহমদ জালাল।

সর্বশেষ টিপাইমুখবিরোধী আন্দোলনে আবির্ভূত হয়েছিলেন নদীসংগ্রামী রূপে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন অঙ্গীকার বাংলাদেশের পরিচালক ছিলেন তিনি। এর আগে গণআন্দোলনের মুখে সিমিটারের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রথম দিককার আন্দোলনেও সোচ্চার ছিলেন। বহুজাতিক গ্যাস কোম্পানি সিমিটারবিরোধী আন্দোলনে সিলেটে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। মাগুরছড়ায় শেভরনের গ্যাস পুড়িয়ে ধ্বংস করার প্রতিবাদ, বিবিয়ানার গ্যাসক্ষেত্র রক্ষার আন্দোলন, টেংরাটিলায় নাইকোর গ্যাস পোড়ানোসহ জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ, হাওরে ফসলডুবির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষে অবস্থান এবং প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে নদীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সবখানেই ছিল তাঁর সোচ্চার উপস্থিতি।

শিশুসংগঠন থেকে ছাত্রসংগঠন, যুবরাজনীতি থেকে আঞ্চলিক আন্দোলন-মইনুদ্দিন আহমদ জালালের প্রেরণার উৎস ছিলেন দুজন। একজনের বসবাস সিলেটে, অন্যজনের সুনামগঞ্জে। এ যেন তাঁর দুই বাসভূমির দুই শ্রেষ্ঠ অহংকার। গণমানুষের রাজনীতিবিদ পীর হবিবুর রহমান ও কমরেড বরুণ রায়ের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও মান্যতা। মানুষ, জীবন, সমাজ ও পৃথিবীকে ভালোবাসার পাঠ নিয়েছিলেন এই দুজনের সান্নিধ্য থেকেই।

সুনামগঞ্জ শহরে তাঁদের পৈতৃক আবাসিক হোটেল জালালাবাদ ছিল প্রগতিশীল রাজনীতির একটি কেন্দ্র। সেখানে একটি কক্ষে জড়ো হতেন জালাল ও তাঁর সহযোগীরা। এই কক্ষকে ঘিরেই কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিক লিখেছিলেন একটি কবিতা। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘আগুনে রেখেছি হাত’ কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি স্থান পায়। ‘একত্রিশ নম্বরের দুঃখ’ শিরোনামের সেই কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তিতে হারানো দিনের হাহাকার-‘একত্রিশ নম্বরের হা করা দরোজা আজ দুঃখের পোস্টার!’
কী বিভোর বিস্ময়! সেই কবিতার চরিত্র জালালও হয়ে গেলেন একটি ‘দুঃখের পোস্টার’! কবির কণ্ঠে আবৃত্তি করা কবিতাটি এবং হোটেলের সেই কক্ষের ভিডিওচিত্র ধারণ করে রাখা হয়েছিল তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা আব্দুল আলীম শাহ নির্মিত ‘দেখবো তোমারে...’ তথ্যচিত্রে।

আজ অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে ভার্চ্যুয়াল পরিসরে আবারও ভাসবেন মইনুদ্দিন আহমদ জালাল। ‘অন্তরে জালাল, অন্তর্জালে জালাল’ শীর্ষক ভার্চ্যুয়ালি স্মরণে। এই অনুষঙ্গে  আমাদের ‘দুঃখের পোস্টার’ সুপ্রিয় মইনুদ্দিন আহমদ জালালকে সযত্নে স্মরণ করছি।

উজ্জ্বল মেহেদী : লেখক ও সাংবাদিক। মইনুদ্দিন আহমদ জালালের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নির্মিত ‘দেখবো তোমারে...’ তথ্যচিত্রের স্ক্রিপ্ট রাইটার।