গ্রিন কার্ড ইস্যুতে পিছু হটল ট্রাম্প প্রশাসন, স্বপ্নভঙ্গ নয়, আপাতত স্বস্তি
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ ০২:৪৩
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকেই বলেন ‘স্বপ্নের দেশ’। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে পাড়ি জমান একটি স্থায়ী ঠিকানার আশায়, উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়, কিংবা সন্তানের জন্য আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি হলো ‘গ্রিন কার্ড’; যা একজন বিদেশি নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস ও কাজ করার অধিকার দেয়।
কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে সেই স্বপ্নের আকাশে যেন হঠাৎ করেই জমেছিল অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা (ইউএসসিআইএস) এমন একটি নীতি ঘোষণা করেছিল, যা অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। নীতিটি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অধিকাংশ গ্রিন কার্ড আবেদনকারীকে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হতে পারে বলে ধারণা তৈরি হয়েছিল।
এই ঘোষণার পর অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা। অনেকের আশঙ্কা ছিল, বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা পরিবার, কর্মজীবন এবং সামাজিক সম্পর্ক হঠাৎ করেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা খাতের হাজারো বিদেশি পেশাজীবী নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।
তবে পরিস্থিতি এখন কিছুটা বদলেছে।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জানিয়েছে, গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে ইচ্ছুক সবাইকে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে না। বরং বিষয়টি নির্ভর করবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিবেচনার ওপর। অর্থাৎ, প্রথমে যে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছিল, পরে তার ব্যাখ্যায় অনেকটাই নমনীয় অবস্থান দেখা গেছে।
এই পরিবর্তনকে ইতোমধ্যে অনেক পর্যবেক্ষক ট্রাম্প প্রশাসনের একটি ‘ইউ-টার্ন’ হিসেবে দেখছেন। কারণ প্রথম ঘোষণার ফলে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, নতুন ব্যাখ্যা তা অনেকাংশে প্রশমিত করেছে।
তবে স্বস্তির পাশাপাশি রয়ে গেছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো নীতির প্রয়োগ পুরোপুরি কর্মকর্তাদের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে, তখন আবেদনকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। কে যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই আবেদন করতে পারবেন আর কাকে নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে; সে সিদ্ধান্ত একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। ফলে অভিবাসীদের পরিকল্পনা, চাকরি কিংবা পারিবারিক জীবনে অনিশ্চয়তার ছায়া দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতও বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের ওপর মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরশীল। তাদের অনেকেই অস্থায়ী ভিসায় এসে পরবর্তীতে গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। যদি সেই পথ জটিল হয়ে ওঠে, তাহলে দক্ষ জনবল আকর্ষণে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বাস্তবে অভিবাসনের গল্প কেবল কাগজপত্র বা আইনি প্রক্রিয়ার গল্প নয়; এটি মানুষের আশা, পরিশ্রম ও ভবিষ্যতের গল্প। একটি গ্রিন কার্ডের আবেদনপত্রের পেছনে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নতুন জীবনের প্রত্যাশা।
সেই কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক অবস্থান পরিবর্তন অনেকের কাছে স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে। তবে অভিবাসন নীতির এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট; স্বপ্নের দেশে স্থায়ী ঠিকানা পাওয়ার পথ এখনও পুরোপুরি মসৃণ নয়।
স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করলেও, দিগন্তে অনিশ্চয়তার মেঘ এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
