https://www.emjanews.com/

17121

economics

প্রকাশিত

১৪ জুলাই ২০২৬ ২০:৪৪

অর্থনীতি

পে স্কেল পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ ২০:৪৪

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতি সংকটের বৃত্ত ভেঙে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে বলে মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে ভর্তুকি সংস্কার, ব্যাংক খাতের সুশাসন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব প্রশাসনের (এনবিআর) সংস্কার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা করতে ১২ সদস্যের আইএমএফ প্রতিনিধিদল বর্তমানে ঢাকা সফর করছে। সফরের অংশ হিসেবে প্রতিনিধিরা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। বৈঠকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণের কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সচিবালয়ে আইএমএফের বাংলাদেশ ও হংকং বিষয়ক মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে আইএমএফও একমত।

তিনি জানান, সরকারের চার মাসের মেয়াদে আর্থিক খাত, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব প্রশাসনে নেওয়া পদক্ষেপে আইএমএফ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।

চার বিষয়ে উদ্বেগ

আইএমএফের পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় ব্যাংক খাত। সংস্থাটির মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দূর করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশেও জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। তাদের মতে, কিছু খাতে ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও নতুন বাজেটে কয়েকটি ক্ষেত্রে বরাদ্দ বেড়েছে, যা বাজেট ঘাটতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নেও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের মতে, বর্তমান রাজস্ব আয়ের পরিস্থিতিতে বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি সরকারি ব্যয় বাড়াবে এবং বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি করে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এজন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া এনবিআর সংস্কারের ধীরগতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা না বাড়ালে সরকারের আয় কাঙ্ক্ষিত হারে বৃদ্ধি পাবে না।

আইএমএফ মনে করে, ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব প্রশাসন ও সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সংসদীয় কমিটিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ সংস্কার কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে।

উদ্বেগের পাশাপাশি অর্থনীতির কয়েকটি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। আইএমএফের মূল্যায়নে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, ডলারের বাজারে অস্থিরতা কমেছে এবং মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটির ইতিবাচক মূল্যায়ন। কারণ, আইএমএফের আস্থা বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, এআইআইবিসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

আইএমএফ প্রতিনিধিদলের চলমান আলোচনা শেষে বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রকাশ করা হবে। সেই মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ ঋণ কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।