হিমালয় অঞ্চলে প্রকৃতির তাণ্ডবে এক লহমায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিশাল এলাকা। পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহের মাটি, পাথর ও বরফের বিশাল অংশ ধসে নদীতে পড়ায় সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল এবং চীনের তিব্বত সীমান্তে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। এ প্রাণঘাতী দুর্যোগে দুই দেশ মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০০ জনই বিদেশি নাগরিক। উদ্ধার অভিযান যত এগোচ্ছে, মৃতের সংখ্যা তত বাড়ছে। নেপাল পুলিশের আশঙ্কা, মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১৬৫ ছাড়িয়ে গেছে এবং তা আরও অনেক বাড়তে পারে।
উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাধি এলাকার কাছে লেন্দে নদীতে বিশাল বরফ ও পাথরের ধস নামায় এই ধ্বংসাত্মক প্লাবনের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও ইউএসজিএস স্পষ্ট করেছে, এটি কোনো টেকটোনিক ভূমিকম্প ছিল না। মূলত হিমবাহের বিশাল ধস এবং তা প্রবল বেগে নদীতে আছড়ে পড়ার প্রভাবেই এ ভূকম্পন ও কাদা-পানির প্রলয়ঙ্করী স্রোতের সৃষ্টি হয়। এর তোড়ে নদী তীরবর্তী একাধিক গ্রাম, ঘরবাড়ি, সংযোগ সড়ক এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিমেষেই বিলীন হয়ে গেছে।
নেপাল পুলিশ ও পর্যটন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কেবল নেপাল অংশেই নিখোঁজ রয়েছেন ৮২৬ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ৫০০ জন বিদেশি পর্যটক। দুই ডজনেরও বেশি দেশের নাগরিক এ দুর্যোগে নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন। এর মধ্যে ভারতীয় ১৭৭ জন, মার্কিন ৬৩ জন, অস্ট্রেলীয় ৩৪ জন, ব্রিটিশ ৩৩ জন এবং কানাডীয় ২৫ জন নাগরিক রয়েছেন। নিখোঁজদের একটি বড় অংশই হিন্দু ও বৌদ্ধদের পবিত্র তীর্থস্থান কৈলাস-মানসসরোবর যাত্রায় যাচ্ছিলেন।
অপরদিকে, চীনের তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে তিব্বতের উজানে পাহাড়ি ধসে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হওয়ায় নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা পুরো উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বর্তমানে দুর্ঘটনাকবলিত দুর্গম এলাকাগুলোতে কয়েক মিটার পুরু কাদার স্তূপ জমে আছে। নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। উদ্ধারকারীরা এখন পর্যন্ত ২০ জন বিদেশিসহ ১২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।
সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে এসেছে। ভারতের পাঠানো তাঁবু ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী হেলিকপ্টারে করে দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর পাশাপাশি পাঁচ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ ও জনবল পাঠাচ্ছে।
পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ ও পরিচালনা করতে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল নুওয়াকোটের বিদুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। স্বজনদের খোঁজে দুর্গত এলাকার বহু মানুষ এখন সামরিক উদ্ধারকেন্দ্রগুলোর সামনে ভিড় করছেন।
