ছবি: সংগৃহীত
খুলনার রূপসায় একই পরিবারের বাবা-ছেলের পরপর হত্যাকাণ্ডে এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক
এক মাস ২০ দিন আগে যে বাড়ির উঠান থেকে ছেলের লাশের জন্য কান্নার শব্দ উঠেছিল, সেই বাড়িতেই আবার নেমে এলো শোকের ছায়া। এবার গুলিতে প্রাণ গেল সেই বাবার।
খুলনার রূপসা উপজেলায় ছেলে জয় ঢালীকে গলা কেটে হত্যার এক মাস ২০ দিন পর তার বাবা আক্তার ঢালীকেও (৬০) গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই পরিবারের দুই পুরুষ সদস্যকে হারিয়ে শোকাহত স্বজনেরা এখন যেন একের পর এক মৃত্যুর ভারে স্তব্ধ।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামের শহীদের মোড়সংলগ্ন নিজ বাড়ির সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
নিহত আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালী (২৭) গত ১৫ আগস্ট একই এলাকার শহীদের মোড়ের একটি চায়ের দোকানের সামনে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আক্তার ঢালী। সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। হঠাৎ একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
গুলির শব্দে আশপাশের মানুষ ছুটে এলেও ততক্ষণে সব শেষ। ঘটনাস্থলেই পড়ে ছিল আক্তার ঢালীর নিথর দেহ। যে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দিনের শেষ সময়টুকু কাটাচ্ছিলেন, সেখানেই মুহূর্তের মধ্যে থেমে গেল তার জীবন।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। কয়েক সপ্তাহ আগের ছেলে হারানোর ক্ষত শুকানোর আগেই বাবাকে হারানোর ঘটনায় পরিবারটি যেন আরেকবার ভেঙে পড়েছে।
আক্তার ঢালীর পরিবারে এই শোক নতুন নয়। গত ১৫ আগস্ট শনিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে একই এলাকার শহীদের মোড়ের একটি চায়ের দোকানের সামনে তার ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে একদল যুবক।
সেই রাতের পর পরিবারটির জীবনে নেমে এসেছিল অন্ধকার। ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে থানায় মামলা করেছিলেন জয়ের মা নাসিমা বেগম।
ওই ঘটনায় রূপসা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। মামলায় এজাহারনামীয় প্রধান আসামিসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কিন্তু সেই মামলার রেশ কাটার আগেই এবার প্রাণ গেল জয়ের বাবা আক্তার ঢালীর।
একটি পরিবার, দুটি মৃত্যু-মাত্র এক মাস ২০ দিনের ব্যবধানে। স্বজনদের কাছে এই সময়টা যেন এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো।
প্রকাশ্য এলাকায় এভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দুর্জনীমহল ও আশপাশের এলাকায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে ছেলে হত্যার ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এবার তার বাবাকেও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন অনেকে।
তাদের প্রশ্ন, একটি হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই একই পরিবারের আরেকজন কীভাবে একইভাবে হত্যার শিকার হলেন?
খবর পেয়ে রূপসা থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। পুলিশ আক্তার ঢালীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আক্তার ঢালীর মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ খুমেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে পূর্বশত্রুতা অথবা ছেলে জয় ঢালী হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
ওসি আনোয়ার জাহিদ বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান শুরু করেছে। পাশাপাশি এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেও যে পরিবারটি ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে আদালত ও থানার দরজায় ঘুরছিল, আজ সেই পরিবারের শোকের তালিকায় যোগ হলো বাবার নাম।
জয়ের মৃত্যুর পর যে বাবা হয়তো সন্তানের হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, সেই বাবাই আজ নেই। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের ওপর নেমে এসেছে আরেক দফা শোকের ভার।
একটি মৃত্যুর কান্না থামার আগেই আরেকটি মৃত্যু; এ যেন একই পরিবারের জীবনে শোকের পুনরাবৃত্তি।
এখন স্বজনদের অপেক্ষা একটাই-কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে এবং এই মৃত্যুর বিচার আদৌ হবে কি না।
রূপসার দুর্জনীমহলের বাতাসে এখন তাই শুধু আতঙ্ক নয়, ভেসে বেড়াচ্ছে একটি পরিবারের অসহায় কান্নাও। যে বাড়িতে একবার সন্তানের জন্য শোক নেমেছিল, সেই বাড়িতেই আবার বাবার লাশ। আর স্বজনদের চোখে একই প্রশ্ন-এই মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে?
