ফাইল ছবি
সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এমরান আহমদ চৌধুরীর নাম ঘোষণার পর স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছেন, অপেক্ষাকৃত অ-জনপ্রিয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় এ আসন বিএনপির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দলের হাইকম্যান্ডের কাছে তারা এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বা “রিভিউ” করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিয়ানীবাজার উপজেলা ও পৌর বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় দলীয় নেতাকর্মীরা একে একে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, ২০১৮ সালের প্রতিকূল নির্বাচনী পরিবেশেও ফয়সল আহমদ চৌধুরী সিলেট-৬ আসনে ১ লাখ ৮ হাজার ভোট পেয়েছিলেন—যা তৎকালীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে সারাদেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট ছিল। তার এই ফলাফল শুধু সিলেট নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিয়ানীবাজার পৌর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান রুমেল এবং পরিচালনা করেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মিছবাহ উদ্দিন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছরওয়ার হোসেন।
বক্তব্যে ছরওয়ার হোসেন বলেন, “২০১৮ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ফয়সল আহমদ চৌধুরী এক মুহূর্তের জন্য পিছু হটেননি। তিনি দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে মাঠে লড়ে ১ লাখ ৮ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার এমন একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যিনি সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ হলেও ভোটের রাজনীতি বোঝেন না। আমরা বিশ্বাস করি—ফয়সল আহমদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দিলে এই আসনে বিএনপি সহজেই জয়ী হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মহাসচিব মনোনয়ন ঘোষণার সময় বলেছেন এটি সম্ভাব্য তালিকা। চূড়ান্ত তালিকা এখনো হয়নি। তাই আমরা দাবি জানাই—চূড়ান্ত তালিকায় যেন ফয়সল আহমদ চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”
সভায় বক্তারা একাধিকবার “রিভিউ” শব্দটি ব্যবহার করে দলের হাইকম্যান্ডের কাছে পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান। তারা বলেন, “আমরা ফয়সল আহমদ চৌধুরীর মনোনয়ন চাই না—আমরা চাই সঠিক ও নিরপেক্ষ রিভিউ। জনগণের মতামত যার পক্ষে থাকবে, আমরা তাকেই মেনে নেবো।”
বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিলপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে যে স্বপ্ন দেখছিলাম, হঠাৎ করেই সেটি শেষ হয়ে গেল। মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু সাংগঠনিক যোগ্যতা দিয়ে এই আসনে জয় পাওয়া অসম্ভব।”
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ফয়সল আহমদ চৌধুরীকে যদি মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাহলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে ধানের শীষ বিজয়ী হবে। আমরা তার পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব।”
বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ফয়েজ আহমদ বলেন, “দীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনের সময় ফয়সল আহমদ চৌধুরী ছিলেন আমাদের ভরসার জায়গা। আমরা যখন কারাগারে ছিলাম, তখনও তিনি পাশে ছিলেন, পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন, এমনকি আর্থিক সহায়তাও করেছেন। এমন একজন নেতার বিকল্প এই মুহূর্তে গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারে নেই।”
তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনি যদি মাঠ জরিপ করেন, দেখবেন এই অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ ফয়সল আহমদ চৌধুরীর নামই বলবে। দলের স্বার্থে, নিশ্চিত বিজয়ের স্বার্থে তার নাম পুনর্বিবেচনা করুন।”
বক্তাদের মতে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক প্রার্থী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, ফলে নির্বাচনী লড়াই কঠিন হবে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য, মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয় প্রার্থী ছাড়া এই আসন উদ্ধার সম্ভব নয়।
তিলপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক এবাদুল হক বলেন, “২০১৮ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও খন্দকার মুক্তাদিরের পর ফয়সল আহমদ চৌধুরী সারা দেশে তৃতীয় সর্বাধিক ভোট পেয়েছিলেন। সেই প্রার্থীকে বাদ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো ঠিক হবে না। তার ভোট, তার জনপ্রিয়তা জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচিত হয়েছিল।”
সভায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নেতাই বলেন, ৩ নভেম্বর প্রার্থী ঘোষণার আগে পর্যন্ত এলাকায় নির্বাচনী আমেজ ছিল। কিন্তু ঘোষণার পর থেকেই নেমে এসেছে ‘সুনশান নীরবতা’। স্থানীয়ভাবে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি ওঠায় বিএনপির মাঠপর্যায়ে এখন এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
বিয়ানীবাজার পৌর বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান রুমেল বলেন, “আমরা নেতাকর্মীদের আবেগ ও ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিই। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত যেটিই হোক, আমরা দলের প্রতীক ধানের শীষের জন্য কাজ করব। তবে আমাদের নেতাকর্মীদের আশা—চূড়ান্ত মনোনয়নে ফয়সল আহমদ চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা তাতী দলের সদস্য আবদুল খালিক, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হাজী এম এ মান্নান চেয়ারম্যান, পৌর বিএনপির সহসভাপতি নজরুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান চেয়ারম্যান, ফয়েজ আহমদ, কবির আহমদ, হোসেন আহমদ মেম্বার, হাসান আহমদ, রাফি চৌধুরী ইরাদ, ছাত্রদল নেতা আহসান জামিল, রায়হান আহমেদসহ যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।
সভায় বক্তারা একযোগে বলেন, “আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। তৃণমূলের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে। ফয়সল আহমদ চৌধুরী শুধু নেতা নন—তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে তৃণমূলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
স্থানীয় নেতাদের ভাষায়, ২০১৮ সালের নির্বাচনের কঠিন সময়ে বিএনপির যে ‘ভোটযুদ্ধ’ তারা দেখেছেন, তার প্রকৃত নেতৃত্বে ছিলেন ফয়সল আহমদ চৌধুরী। তার নেতৃত্বেই বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জে জাতীয়তাবাদী চেতনা আবারও জেগে উঠেছিল। তাই তারা বিশ্বাস করেন, তার নেতৃত্বেই এ আসন পুনরুদ্ধার সম্ভব।
সার্বিকভাবে আলোচনা সভাটি পরিণত হয় বিএনপির তৃণমূল নেতাদের এক আবেগঘন রিভিউ দাবিতে। নেতাকর্মীদের বক্তব্যে স্পষ্ট—তারা দলের সিদ্ধান্ত মানলেও, মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রার্থী চান।
সভা শেষে বক্তারা একবাক্যে বলেন, “আমরা ফয়সল আহমদ চৌধুরীর মনোনয়ন চাই না, আমরা চাই রিভিউ। যদি সেই রিভিউতে দেখা যায় জনগণ ফয়সল চৌধুরীকে চায়, তাহলে কেন্দ্রীয় নেতারা যেন সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটান।”
