ছবি: ইমজা নিউজ।
'আমরা সব বুঝি। ১৫ বছর তো আমরাই হেকিম চেয়ারম্যানকে দেখেছি, এখনো দেখছি। তার মশাল আন্দোলনে লোকবল, মশাল আর কেরোসিন তিনটাই দিয়েছে অন্যরা।' 'লোকাল প্রার্থী' আন্দোলনে মশাল মিছিলকে এভাবেই মূল্যায়ন করলেন রাধানগর গ্রামের ব্যবসায়ী আব্দুস শুক্কুর।
তিনি বলেন, গোয়াইনঘাটের বাইরের মানুষ না বুঝলেও এই নাটক যে বা যারা সাজিয়েছে আমরা বুঝে গেছি।
গত ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় সালুটিকর গ্রাম থেকে বের হয় হাজার খানেক মানুষের একটি মিছিল। সেখান থেকে স্লোগান তোলা হয়, লোকাল না বাইরের, লোকাল লোকাল। হেকিম ছাড়া মানিনা মানবনা।
সিলেট-৪ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের নির্দেশে প্রার্থী হওয়া আরিফুল হক চৌধুরী প্রচারে নামার পরই এই কাণ্ড ঘটান মশালওয়ালারা। তারা দাবি করেন, সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আব্দুল হেকিমকে ধানের শীষের মনোনয়ন দেয়ার জন্য।
ভালো বিতর্ক ওঠে সিলেট সিটির দুইবারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে। এসময় বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান, এমন বিতর্কিত স্লোগান সিলেট-৪ আসনের বিএনপি বা জনগণের নয়। ওটা একটা পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা মাত্র। এসময় তারা জানান, গোয়াইনঘাটের বিএনপি নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হেকিম চৌধুরী আওয়ামী লীগ আমলে ১৬ বছর নির্বিঘ্নে ছিলেন, কোনো মামলার মুখোমুখি হননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের ঘনিষ্ঠ হয়ে সরকারি লুটপাটে অংশ নেন এবং বিএনপিকে নিষ্ক্রিয় রাখেন। হেকিমের প্রভাবে গোয়াইনঘাটে সরকারবিরোধী কোনো আন্দোলন হয়নি, বরং পাথর-বালুর সিন্ডিকেট ও চোরাচালানে তিনি আওয়ামী নেতাদের সহযোগিতা করেছেন। বিএনপির তৃণমূল নেতারা অভিযোগ করেন, তিনি দলের রাজনীতি নয়, ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করেছেন এবং আওয়ামী নেতাদের ব্যবসা পরিচালনায় ভূমিকা রেখেছেন। শেখ হাসিনার পতনের পরও তিনি আগের মতোই প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন, যা স্থানীয় বিএনপির মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিএনপি জানে টাকার জন্য তিনি কত নিচে নামতে পারেন।
গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপি নেতা আরিফ ইকবাল নেহাল জানান, গোয়াইনঘাটের অনেক নেতাই মামলা কী জিনিস চোখে দেখেনি। অথচ বাংলাদেশের ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারাও মামলায় বিপর্যস্ত ছিল। এসব নিয়ে গোয়াইনঘাটের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে ক্ষোভ। গত ৫ আগস্টের পরে আওয়ামী লীগের কুখ্যাত দুর্নীতিবাজ সুভাষের সব ব্যবসা এখন নিয়ন্ত্রণ করেন বিএনপির সুবিধাবাদী নেতা হেকিম চৌধুরীর অনুসারীরা।
গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন জানান, আব্দুল হেকিম গত ১৬ বছর স্থানীয় বিএনপিকে পুতুল বানিয়ে রেখেছিলেন। নিজে রাজপথে নামেননি, কাউকে নামতেও দেননি। সব সময় নিরাপদ ডেরায় থেকে আওয়ামী লীগের নিখাদ সহযোগী হিসেবে প্রমাণ করতে চাইতেন নিজেকে।
আব্দুল হেকিম আওয়ামী লীগে সরাসরি যোগদানের অনেক চেষ্টা করেছেন। সাবেক এমপি ইমরান আহমদকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু দলে আনুষ্ঠানিক প্রবেশে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের নিষেধ থাকায় সেই আশা পূরণ হয়নি তার।
আর মশাল মিছিল আয়োজন নিয়ে এলাকার সবাই ওপেন সিক্রেট জেনে গেছেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীরা জানিয়েছেন, এখানে বড় গেম খেলেছে জামায়াত। হেকিম চৌধুরীর লাভ হবেনা জেনেও নানা জামায়াত প্রার্থীর সুবিধার জন্য 'লোকাল প্রার্থী' নেরেটিভ গড়তে ওই লোকবল সংগ্রহের ব্যয় বহন করেছে জামায়াত। বাঁশ ও কেরোসিন আওয়ামী লীগের লুটেরা সম্রাট সুভাষ যোগান দিয়েছে।
এ বিতর্কের মাঝে আরিফুল হক চৌধুরী সোমবার গণসংযোগ চালিয়েছেন গোয়াইনঘাট নন্দিরগাঁও ইউনিয়নে। এসময় তিনি ইমজা নিউজকে জানান, বিএনপির নেতাকর্মী ও ভোটার সব সময় দলের সিদ্ধান্তকে সম্মান করে। তারা কখনোই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে চিন্তাও করে না। এ আসনে মশাল কাণ্ড যা ঘটেছে, ওটা বাইরের ষড়যন্ত্রকারীদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ তৈরির চেষ্টা মাত্র। এরা যাই করুক, ভোটাররা নিজের ভালো-মন্দ নিজেরা ভালো বুঝেন বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে সিলেট-৪ আসনের বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ও সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আব্দুল হেকিম চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের ১৬ বছর নিয়ে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই নয়। লোকাল প্রার্থী সুর তুলতে জামায়াত ও আওয়ামী লীগের অর্থায়নের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, সিলেট-৪ আসনে বিএনপি এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। এই অবস্থায় প্রার্থীতার দৌড়ে তিনি মাঠে রয়েছেন। দল যখন একক প্রার্থী ঘোষণা করবে, তখন সব নেতাকর্মী ধানের শীষ নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তখন দেখবেন, বিএনপির ভেতরে কোনো বিরোধ থাকবে না।
