https://www.emjanews.com/

13248

sylhet

প্রকাশিত

২২ জানুয়ারী ২০২৬ ১৪:৪৮

আপডেট

২২ জানুয়ারী ২০২৬ ১৫:২৯

সিলেট

‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’ : তারেক রহমান

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারী ২০২৬ ১৪:৪৮

ছবি- বিএনপি মিডিয়া সেল

সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলো বিএনপি। সে লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। এতে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ এবং সিলেটের বিভিন্ন আসনের বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশে বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে সালাম জানিয়ে তারেক রহমান সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় অভিবাদন জানিয়ে বলেন, ‘আফনারা ভালা আছেন নি।’

তিনি বলেন, এই যে আপনারা এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হয়েছেন—এই সমবেত হওয়ার পরিবেশ তৈরির জন্য হাজারো মানুষ গত ১৫ বছর ধরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আপনাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আপনাদের কথা বলার বাকস্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, আপনাদের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আজ আপনারা এখানে একত্রিত হয়েছেন। এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমরা আমাদের মাঝ থেকে ইলিয়াস আলীকে হারিয়েছি, জুনায়েদকে হারিয়েছি, দিনারকে হারিয়েছি। সারা দেশে গত ১৫ বছর ধরে যারা এই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল এক বছর আগে, তারা যখন এই দেশের টুঁটি চেপে ধরেছিল, বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল—তারা শুধু ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেনি, সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েও সন্তুষ্ট থাকেনি। তারা ইলিয়াস, জুনায়েদ, দিনারের মতো শত-হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে বিএনপিসহ লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে গুম, খুনের মামলা দিয়ে জর্জরিত করা হয়েছিল। আমরা দেখেছি গত ১৫ বছরে উন্নয়নের নাম করে কীভাবে দেশের মানুষের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়েছে।

সিলেট–ঢাকা মহাসড়কের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০৫ সালে আমি এসেছিলাম, যখন সুনামগঞ্জে বন্যা হয়েছিল। তখন আমার আসতে সাড়ে চার ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল। কিন্তু আজ প্রায় ১০ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। সিলেটের এই পুণ্যভূমির বহু মানুষ আছেন যারা লন্ডনে যাতায়াত করেন—লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না।

তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে আমরা দেখেছি নির্বাচনে কীভাবে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে, কীভাবে আমি-ডামি নির্বাচন হয়েছে, কীভাবে নিশিরাতের নির্বাচন হয়েছে। এসব তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার তথা রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আজ আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে, যারা সবার জন্য রাজপথে নেমে এসেছিলেন, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন।

তারেক রহমান বলেন, স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে সংসার সুন্দর হয়। আমাদের মা-বোনেরা যেন আপনাদের পাশে থেকে সংসারকে স্বচ্ছলভাবে গড়ে তুলতে পারেন—সে জন্য গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে সকল দুস্থ, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। কিন্তু এই ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করতে হলে ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন মা-বোনদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আগামী ধানের শীষের বিএনপি সরকার সেই শিক্ষিত মা-বোনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায়।

তারেক রহমান বলেন, টেক ব্যাক বাংলাদেশের আরেকটি বড় কাজ বাকি আছে। আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী, তরুণ সমাজের সদস্য বেকার হয়ে বসে আছেন। আমরা তাদের বেকার করে রাখতে চাই না। এই বেকারদের জন্য আমরা কর্মসংস্থান তৈরি করতে চাই। সিলেটের মানুষদের বড় একটি অংশ লন্ডন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে যান। আমরা তাদের বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিতে চাই—প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চাই। সরকার গঠন করলে আমরা তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলব, যাতে সারা পৃথিবীতে তাদের ছড়িয়ে দিতে পারি।

তিনি আরও বলেন, বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, এই দেশের ভেতরে কিছু মহল ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে। গত কয়েক দিনে আপনারা দেখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট কীভাবে ডাকাতি করা হয়েছে। যারা এই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, তারা যেভাবে আপনাদের ভোট ডাকাতি করেছিল—ঠিক একইভাবে আবার সেই ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। বিদেশে বসে তারা ষড়যন্ত্র করছে। ইলিয়াস, জুনায়েদ, দিনারসহ হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যে অধিকার আমরা অর্জন করেছি, ২৪-এর গণআন্দোলনে সিলেট শহরে ১৩ জন জীবন দান করেছেন—এই প্রাণগুলোর বিনিময়ে যে অধিকার আদায়ের পথে আমরা নেমেছি, একটি কুচক্রী মহল তার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা যায়।

এ সময় একটি দলের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, দোজখের, বেহেশতের, পৃথিবীর, কাবার মালিক আল্লাহ। যার মালিক আল্লাহ, সেটা অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। অথচ নির্বাচনের আগেই একটি দল টিকিট দেওয়ার কথা বলছে—যার মালিক মানুষ নয়। সব কিছুর মালিকানা আল্লাহর, অথচ তারা শিরিক করছে। আগেই আপনাদের ঠকাচ্ছে—নির্বাচনের পরে কীভাবে ঠকাবে, একবার ভাবুন। তারা শুধু মানুষকে ঠকাচ্ছেই না, মুসলমানদের শিরিকের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, অমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি—এবার একে দেখেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সময় কারা কী ভূমিকা রেখেছিল, কার ভূমিকার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, লক্ষ লক্ষ মা-বোনের সম্মানহানি হয়েছে—বাংলাদেশের মানুষ তা দেখেছে। এই কুফরি, হঠকারিতা ও মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের টেক ব্যাক বাংলাদেশে থাকতে হবে। আমরা দেশকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করেছি, এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু ভোট আর কথা বলার অধিকার নয়—মানুষকে স্বাবলম্বী করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ যেন ঠিকভাবে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকতে পারে, নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারে—এই ব্যবস্থাই টেক ব্যাক বাংলাদেশ।

তারেক রহমান বলেন, যেমন দিল্লি নয়, তেমনি পিন্ডি নয়—নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। আমরা বিশ্বাস করি, দেশের মানুষই রাজনৈতিক সকল ক্ষমতার উৎস। তাই আমরা দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিশ্বাস করি। বিএনপি শুধু ভোট ও কথা বলার অধিকার নয়—দেশের নারী সমাজ, মা-বোন, যুব সমাজ, কৃষকসহ প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায়।

তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার সময়, খালেদা জিয়ার সময় যেভাবে দেশ এগিয়ে গিয়েছিল—কলকারখানা তৈরি হয়েছিল, কর্মসংস্থান হয়েছিল, মানুষ বিদেশে কাজের সুযোগ পেয়েছিল—সেই ধারায় আমরা আবার দেশ গড়তে চাই। তাই আমাদের অঙ্গীকার, করবো কাজ, গড়বো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।

বক্তব্যের শেষে ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে তারেক রহমান বলেন,বিএনপি সরকার গঠিত হলে আমরা নবী করীম (সা.) এর ন্যায়পরাণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবো, ইনশাআল্লাহ।

এর আগে সকাল থেকেই বিএনপির নির্বাচনী জনসভাকে ঘিরে আলিয়া মাদরাসা মাঠ ও আশপাশের সড়ক এলাকায় লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সিলেট নগরীসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে দলে দলে নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হন। শীত উপেক্ষা করে বুধবার রাত থেকেই অনেক নেতাকর্মী মাঠে অবস্থান নেন।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে তারেক রহমান সভামঞ্চে ওঠেন। পরে দুপুর ১টার দিকে তিনি জনসভায় বক্তব্য শুরু করেন। এ সমাবেশ থেকে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মোট ১১টি আসনে দল ও জোট মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।