সিলেটে ফ্যাক্টর ‘ফার্স্ট টাইম’ ভোটার : কী কৌশল নিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত?
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১২:১৯
সিলেটের ভোটের মাঠে এবার মূল লড়াইটা হতে পারে দেড় লক্ষাধিক নতুন ভোটারের সিদ্ধান্তে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই হয়ে উঠেছেন প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক বা ফ্যাক্টর। নির্বাচন কমিশন সূত্র মতে গত দেড় বছরে সিলেটের ৬টি আসনে নতুন ভোটার বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৭০ জন। জীবনের ‘প্রথম ভোট’ দিতে যাওয়া এই তরুণরা গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা ও প্রতিশ্রুতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন। তারা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুবই সক্রিয়। সিলেটের রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে তরুণরা কেবল ভোট দেওয়ার জন্যই কেন্দ্রে যাবেন না বরং তারা এমন প্রার্থী খুঁজছেন যিনি তাদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবেন। মুক্তিযুদ্ধ বা গণতন্ত্রের পাশাপাশি তরুণদের কাছে এবার বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আগামীতে কী পরিবর্তন আসবে।
সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ও প্রথমবার ভোটার হওয়া ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই একজন প্রার্থীর সবকিছু জানতে পারছি। তার ব্যক্তিগত জীবন কেমন বা তার ওপর বিশ্বাস রাখা যায় কি না সেটা যাচাই করছি। যে প্রার্থী তরুণদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দেবেন এবং যার অতীত পরিচ্ছন্ন আমি তাকেই ভোট দেব। তিনি যে দলেরই হোন না কেন।’
আরেক তরুণ ভোটার ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এবার সেই সুযোগ এসেছে। যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এবং দুর্নীতিবিরোধী শক্ত অবস্থান নেবে তাদের ব্যালটেই সিল মারব।’
সিলেটের রাজনৈতিক দলগুলোও তরুণদের এই মনোভাব বুঝতে পেরে পাল্টে ফেলেছে প্রচারণার কৌশল। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলগুলো ডিজিটাল প্রচারণাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে তরুণদের টার্গেট করে কন্টেন্ট তৈরি করা হচ্ছে।
সিলেটের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে তরুণ ভোটাররা খুব দ্রুত মত বদলাতে সক্ষম। কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা কর্মমুখী হবে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তারা। এছাড়া উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান তরুণদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থীরাও তাদের ইশতেহারে ও বক্তব্যে এসব বিষয়কে সামনে আনছেন।
বিএনপি তরুণদের টানতে ইতিবাচক রাজনীতির কথা বলছে। তারা স্লোগান ঠিক করেছে ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক’। দলটির পক্ষ থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভাতা এবং ফ্রিল্যান্সারদের আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। সিলেটে দলটির প্রার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে নিয়মিত তরুণদের জন্য বিশেষ ভিডিও ও রিলস প্রকাশ করা হচ্ছে।
সিলেট-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির তার এক নির্বাচনী সভায় বলেছেন, সিলেটে আইটি পার্ক করার নামে একটা ভুতুড়ে স্থাপনা করা হয়েছে। বিএনপি এই আইটি পার্ককে সিলেটের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মূলকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। যেখানে আইটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠবে, হাজারো তরুণের চাকরি হবে, হাজারো তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও বসে নেই। তারা জুলাইয়ের চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। দলটির পক্ষ থেকে ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ গঠন এবং উদ্যোক্তা তৈরির মতো আধুনিক পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। সিলেটে দলটির প্রার্থীরা কল্যাণমূলক রাজনীতির কথা বলে তরুণদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন নির্বাচনী সভায় সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেছেন, জামায়াত এক্ষেত্রে সফলতা দেখতে পারছে, তরুণদের মধ্যে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেয়ার জোয়ার উঠেছে।
এছাড় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিও সিলেটের মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলটির প্রার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় র্যাপ গান, আধুনিক সুরের থিম সং ও রিলস প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জেন-জি প্রজন্মকে কাছে টানার চেষ্টা করছেন।
সিলেটের গ্রামীণ জনপদেও তরুণ ভোটারদের প্রভাব বাড়ছে। যদিও সেখানে পারিবারিক সিদ্ধান্তের প্রভাব কিছুটা থাকে, তবুও স্মার্টফোনের কল্যাণে গ্রামীণ তরুণরাও এখন শহরের তরুণদের মতোই সচেতন। সিলেটের ৬টি আসনেই প্রার্থীরা তাই শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় তরুণদের মন জয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কারণ তারা জানেন যে এই দেড় লক্ষাধিক তরুণ ভোটারের রায় যার দিকে যাবে বিজয়ের হাসি হয়তো তিনিই হাসবেন।
