ফেসবুক স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে উন্নত দেশে যাওয়ার চোখ ধাঁধানো সব বিজ্ঞাপন। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা যুক্তরাজ্য; স্বপ্নপূরণের এমন লোভনীয় হাতছানিতে প্রলুব্ধ হয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ পা বাড়াচ্ছেন এক ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে।
সিলেটে সম্প্রতি উন্মোচিত হয়েছে এমনই এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর প্রতারণা চক্রের খবর। মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে সাজানো হচ্ছে ‘ভিসা পাওয়ার’ মিথ্যা স্বীকারোক্তি, আর সেই ভিডিওর মায়াজালে ফেলে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে ভিসার জন্য তাদের কাছে আসতে। মানুষজন কোনো যাচাই বাছাই ছাড়াই তাদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে হারাচ্ছে জমিজামা ও বাড়ি বিক্রির লক্ষ লক্ষ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের উপশহর এলাকার AMEX Sssociates নামক একটি কনসালটেন্সি ফার্ম এই অভিনব প্রতারণার মূল হোতা। সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে তারা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সাজানো ভিডিও তৈরি করছে। স্থানীয় কিছু অসচ্ছল বা সুযোগসন্ধানী মানুষকে মাত্র ১,০০০ টাকার বিনিময়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা মুখস্থ বলছেন;“আমি থেকে খুব সহজেই কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভিসা পেয়েছি।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভুয়া ভিডিওগুলো করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সিলেটসহ সারা দেশে। আর এই সাজানো ভিডিও বিশ্বাস করে সরল বিশ্বাসে স্বপ্নের দেশে যাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটিতে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। পাসপোর্ট ও ফাইল জমা দেওয়ার নাম করে একেকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা।
এই ভয়ংকর প্রতারণার সত্যতা যাচাই করতে নামক সেই কনসালটেন্সি ফার্মটিতে সরেজমিনে অনুসন্ধানে যায় স্থানীয় সাংবাদিকরা। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার উপস্থিতি টের পেয়েই অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে শুরু হয় চরম লুকোচুরি।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কাছে যখন সাজানো ভিডিও ও ভুক্তভোগীদের অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয়, নিজের অপরাধ ঢাকতে এবং সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে তিনি একপর্যায়ে রাজনৈতিক পরিচয়’ও ক্ষমতার দাপট দেখানোর চেষ্টা করেন।
তবে অনুসন্ধানী দল যখন ভুক্তভোগীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও ১,০০০ টাকার বিনিময়ে তৈরি করা ভিডিওর অকাট্য প্রমাণ সিইওর সামনে তুলে ধরে, তখনই সুর পাল্টে যায় তার। তোতলামি শুরু করার পর একপর্যায়ে তিনি চরম উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কোনো সদুত্তর না দিয়েই দ্রুত নিজের অফিস কক্ষ ত্যাগ করে পালিয়ে যান এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত মানুষ এই বিজ্ঞাপনের মায়াজালে পড়ে এখানে আসছেন এবং সর্বস্ব হারাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা চোখের সামনে দেখছি কীভাবে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে। একটা ভিডিও বানাতে এদের খরচ মাত্র এক হাজার টাকা, আর সেই ভিডিও দেখে মানুষ জমি-জমা বেচে লক্ষ লক্ষ টাকা এনে এদের হাতে তুলে দিচ্ছে। কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা কঠোর নজরদারি না থাকায় এরা বহাল তবিয়তে এই সাজানো কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।”
স্যোসাল মিডিয়াতে ওরা খুব বেশি একটিভ। ওমুকের ভিসা হয়েছে, তমুকের কানাডা ভিসা করেছি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনারাও আসুন। মিডিয়াতে প্রচারিত এসব ভূয়া বিজ্ঞাপন দেখার জন্য প্রশাসনের একটা মনিটরিং থাকা দরকার বলে মনে করছেন রিক্রুটিং এজেন্ট ব্যবসায়ী খন্দকার শিপার আহমদ।
আটাব এর সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার জলিল বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স ছাড়া যারা ট্রেভেল এজেন্সির যারাই বিদেশে পাঠানোর কথা বলে, ধরে নিতে হবে এটা প্রতারণার সামিল। এবং মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। ট্রেভেল এজেন্সির নামধারী কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে সিলেটে এদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে সিলেটের জনসাধারণ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসন জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিবে।
যদিও সিলেট মেট্রোপলিটান পুলিশের কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী বলছেন, ‘বায়বীয়ভাবে অভিযোগ করলে তো হবে না। তথ্য প্রমাণ নিয়ে, কার লাইসেন্স আছে, কার নাই সুনির্দিষ্ট তালিকা দিলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। লাইসেন্স চেক করার দায়িত্ব পুলিশের নয়। সব দায়িত্ব পুলিশের নিলে হবে না। এই ৩ হাজার অবৈধ লাইসেন্সধারী ট্রেভেল এজেন্সিকে খুঁজে পেতে আমাদের কদিন সময় লাগবে? আমার তো লো এন্ড অর্ডারের কাজ।’
প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন সিলেট অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে -এর মতো ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোড় কনসালটেন্সি ফার্মগুলো যেভাবে মানুষের আবেগ ও অর্থ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তা এক কথায় অমানবিক ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
শত শত মানুষের প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন যেন এমন প্রতারকদের কারণে দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়, সেজন্য এখনই প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ। না হলে এই নীরব চুরির শিকার হয়ে নিঃস্ব হতে থাকবে আরও হাজারো পরিবার।
