সিলেটের ৩ খু/নে নেটিজিনদের প্রশ্নবাণ: ‘গৃহকর্মীর প্রেম’ গল্প নাকি অন্যকিছু?
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১৫:০২
সিলেট নগরীর রায়নগরের আলোচিত ত্রিমুখী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের দ্রুত রহস্য উদঘাটনের দাবিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক। হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘গৃহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কজনিত বিরোধে খুন’- এমন ব্যাখ্যা সামনে আনায় আইনজীবী, বিশ্লেষক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীদের অনেকেই তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ দিনের সম্পর্ক ছিল বাবুল মিয়ার। ঘটনার দিন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা দেওয়ায় সে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনজনকে হত্যা করে- এমন দাবি পুলিশের।
তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভিন্ন মহল। কোতোয়ালি থানার ওসি খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির জানান, সিসিটিভি ফুটেজে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে লাল পোশাক পরা এক ব্যক্তিকে বাসায় ঢুকতে দেখা যায়। এরপর ক্যামেরা বন্ধ হয়ে যায়। ওই সূত্র ধরে সন্দেহভাজন বাবুলকে শনাক্ত করে পুলিশ এবং পরবর্তীতে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যার কথা স্বীকার করেছে।
নেটিজেনদের প্রশ্ন
আইনজীবী ও সাংবাদিক মইনুল হক বুলবুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন- শারীরিক সম্পর্কের উদ্দেশ্যে গেলে সকাল সাড়ে ৯টা কি উপযুক্ত সময়? যদি সেটাই উদ্দেশ্য হয়, তবে কেন সঙ্গে ধারালো ছুরি রাখা হবে? খুনের পর ব্যবহৃত অস্ত্র পাশেই ফেলে যাওয়া এবং ঘটনার পর দীর্ঘসময় ওই এলাকায় অবস্থান করার যুক্তিও তিনি খুঁজে পান না।
কাতার প্রবাসী প্রদীপ দাসও একই ধরনের প্রশ্ন তুলে বলেন, আগে থেকেই ছুরি সঙ্গে রাখা পরিকল্পিত অপরাধের ইঙ্গিত দেয়। তিনটি খুনের পরও অভিযুক্ত কেন আত্মগোপনে না গিয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছিলেন- এ বিষয়টিও সন্দেহজনক বলে মনে করছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহাজুর ইসলাম বলেন, আটক হওয়ার পরপরই একজন ব্যক্তি এত দ্রুত ও বিস্তারিতভাবে দায় স্বীকার করলেন কেন- এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। তার মতে, অন্য কোনো পক্ষকে আড়াল করতেই ঘটনাটিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
জমি বিরোধ ও অন্য মোটিভের প্রশ্ন
এলাকার একাধিক বাসিন্দা ও পরিচিতজনের দাবি, নিহত ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারের জমি ও সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধও এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। জানা গেছে, রিকাবীবাজার এলাকায় জমি নিয়ে একটি স্বত্ব মামলা চলছিল, যার শুনানি আগামী ১৯ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল।
নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, ২০২৩ সালে করা ওই মামলার শুনানিতে আব্দুস সাত্তার নিয়মিত হাজিরা দিতেন। সাম্প্রতিক এক শুনানিতে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে মামলার শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটায় নতুন করে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
নিহতের পরিবারের ঘনিষ্ঠজন রেজাউল করিম নাচন বলেন, ঘটনার ব্যাখ্যা তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ ডাকাতি, ব্যবসায়িক বিরোধ বা পরিকল্পিত হামলার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্য
আজ বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, বাবুল মিয়া পরিকল্পনা করেই ছুরি নিয়ে বাসায় প্রবেশ করে এবং ধারাবাহিকভাবে তিনজনকে হত্যা করে।
তিনি বলেন, বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাশের একটি ঝোপঝাড় এলাকা থেকে রক্তমাখা ব্যাগ ও ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছুরিটি ধোয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বাসার ভেতরেও রক্ত পরিষ্কার করার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে। ছুরি ও ব্যাগে থাকা রক্তের নমুনা ঘটনাস্থলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল দাবি করেছে, রংমিস্ত্রীর কাজ করতে গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে কোনো আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যাকাণ্ড শেষে বাবুল ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে ব্যালকনি দিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তার হাত-পায়ের ছাপ ও রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
এখনও রয়ে গেছে প্রশ্ন
যদিও পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে আলমারি খোলা থাকা, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে আসায় তদন্ত নিয়ে জনমনে সংশয় কাটেনি।
নেটিজেনদের দাবি, কেবল একজনের জবানবন্দির ওপর নির্ভর না করে জমি বিরোধ, ব্যবসায়িক শত্রুতা, ডাকাতি- সব দিক খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে রায়নগরের মিতালী এলাকার একটি বাসা থেকে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৫) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (১৫)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের চার সন্তানই প্রবাসী।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো নগরজুড়ে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রায়নগরবাসীর উদ্যোগে নগরীর চৌহাট্টাস্থ শহিদ মিনারের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই কর্মসূচী থেকেও অনেক বক্তা পুলিশের এই দাবির বিরোধিতা করেন। তারাও নানা প্রশ্ন তোলেছেন।
