সিলেটে তিন খুন: তছনছ বাসা-খোয়া গেছে কাগজপত্র, ১৯ আগস্ট আদালতে ছিল শুনানি
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৩৬
ছবি: সংগৃহীত
সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে সাবেক কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর নিকুঞ্জ ভিলার তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে তিনজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
নিহতদের গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের দেয়াল ও বাথরুমের বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ দেখা গেছে। সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া গেছে।
হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না পুলিশ। তবে রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে চলমান বিরোধ ও মামলার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। কারণ, ওই মামলার একটি শুনানি আগামী ১৯ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল।
নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন সাত্তার। ২০২৩ সালে তিনি ওই সম্পত্তি নিয়ে স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২১১/২৩। পরে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলায় আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩ এবং আগামী ১৯ আগস্ট শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল।
আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক আরও বলেন, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার আদালতে হাজিরা দিতেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি শুনানিতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন সিরাজুল ইসলাম তাঁকে হুমকি ও খারাপ ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা, পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে বাসার সিসিটিভি ক্যামেরাও বন্ধ ছিল। তবে পুলিশ বলছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার আগেই কেউ বাসায় প্রবেশ করে থাকতে পারে। বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। রিকাবীবাজারের জায়গা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তিনজনকে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রোব খোলা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য, আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম বাসায় একাই থাকতেন। তাঁদের সঙ্গে একজন গৃহকর্মী থাকতেন। নিহত দম্পতির আত্মীয় মুন্না মিয়া জানান, বুধবার সকাল নয়টার দিকেও তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপরই তাঁদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর চার সন্তান- দুজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুজন যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তাঁদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ফলে বুধবার পর্যন্ত নিহত দম্পতির সন্তানদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
