ফেসবুক পোস্ট নিয়ে অন্যদের ঝগড়া, থামাতে গিয়ে খুন হন রাসেল
দক্ষিণ সুরমার সিলামে খুন
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৩৩
ছবি: সংগৃহীত
ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি। সেই ঝগড়া থামাতে গিয়ে প্রাণ গেল ২৩ বছরের যুবক রাসেল আহমদ শাহের। স্থানীয়দের দাবি, রাসেল নিজে ওই বিরোধে জড়িত ছিলেন না; ‘বাচ্চারা মারামারি করছো, মুরব্বিরা দেখবেন’ বলে ঝগড়া থামানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। এ সময় হামলাকারীদের আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান রাসেল।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) জুমার নামাজের পর সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের চকেরবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাসেল ওই এলাকার শারুক মিয়ার ছেলে। তাকে প্রথমে লাকড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত এবং পরে ছুরিকাঘাত করা হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। গুরুতর আহত অবস্থায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এলাকার মুরুব্বী হুমায়ুন শাহ পুলিশকে জানান, ‘খুনিদের সঙ্গে তার ভাতিজা ফারহানের বিরোধ থেকে এই খুনের ঘটনা ঘটে। ফেসবুকে কি লিখছস? গালাগালি করে তুই আয় তোরে ছেদাইমু বলে চেরাগ আলী ও আনোয়ারের ছেলেরা ফারহানকে ডেকে নেয়। আসার পর ৭/৮ জন সুমন আলী,মুজাহিদ আলী ফাহিম, সামাদ, তারা মারামারি শুরু করে। যে ছেলেটি মারা যায়, সে মারামারিতে ছিলো না। সে ঝগড়া থামাতে ছিলো। সে বলেছিলো ‘বাদ দাও বাচ্চারা মাইর করছো মুরব্বীরা দেখবো নে।’ এরপরেও চেরাগ আলীর পুয়া তারে লাকড়ি দিয়ে তার মাথায় বাড়ি মারে। আমার ভাতিজা শাহ ফারহানকে খুঁজতে গিয়ে তারা আমার দোকানে যায়। এসময় দোকান থেকে আইফোনসহ ৮০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়।’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলামের হযরত শাহ তৈয়ব ছৈলানি (রহ.) মাজার ও মসজিদ এবং ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনা নিয়ে চকেরবাজার এলাকার শাহ ও শেখ গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুক পোস্ট নিয়ে বিরোধের জেরে কয়েকজন শাহ ফারহানকে ডেকে নেয়। সেখানে ফারহানের সঙ্গে ৭-৮ জনের মারামারি শুরু হয়। এ সময় রাসেল সেখানে গিয়ে ঝগড়া থামানোর চেষ্টা করেন। তিনি কাউকে মারধর করছিলেন না; বরং উভয় পক্ষকে থামাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বাদ দাও, বাচ্চারা মারামারি করছো, মুরব্বিরা দেখবেন।’
কিন্তু এতে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। স্থানীয় মুরুব্বি হুমায়ুন শাহের পুলিশকে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে চেরাগ আলীর এক ছেলে রাসেলকে লাকড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। পরে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, মাজার-মসজিদ ও ওয়াকফ এস্টেট নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। গত ২২ আগস্ট একই মাজার ও মসজিদ নিয়ে শাহ ও শেখ গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। ওই ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হযরত শাহ তৈয়ব ছৈলানি (রহ.) ওয়াকফ এস্টেট পরিচালনা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। গত ২৯ জুলাই ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়াকফ প্রশাসন থেকে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিককে সভাপতি এবং দক্ষিণ সুরমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সহসভাপতি করে নয় সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটিতে মোতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পান ফজলু মিয়া।
পরে কমিটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শাহ আব্দুল মান্নান হাইকোর্টে রিট করেন। ১৬ আগস্ট শুনানি শেষে হাইকোর্ট নতুন অনুমোদিত কমিটি বহাল রাখেন। তবে সাময়িকভাবে মোতাওয়াল্লি ফজলু মিয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে আবেদ রাজাকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা চলছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
রাসেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চকেরবাজার এলাকায় শাহ ও শেখ গোষ্ঠীর মধ্যে ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ ইটপাটকেল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন।
খবর পেয়ে দক্ষিণ সুরমা ও মোগলাবাজার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সিসিটিভিতে শনাক্ত ১২, এখনও আটক নেই
রাসেল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ১২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ এরশাদুল হক ভূইয়া বলেন, ‘ এখনও মামলা হয়নি। ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের ধরতে পুলিশের টিম কাজ করছে। আসামীদের গ্রেফতারেও পুলিশ চেষ্টা করছে।’
নিহত রাসেল আহমদ শাহের মরদেহ সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। সেখানে তার ময়নাতদন্ত চলছে।
