শিরোনাম
সিলেটসহ সারাদেশে গ্যাস বন্ধের বিষয়ে পেট্রোবাংলা বলছে গুজব সিলেটে ময়লার ছবি তুলে জিতে নিন লাখ টাকা: সিসিকের ছবি তোলার প্রতিযোগিতা সিলেটে স্ত্রীর ছবি তোলার প্রতিবাদ করায় স্বামীকে হ/ত্যা, গ্রেফ/তার এক দ্বারপ্রান্তে ‘মুরাসু’, চার সমুদ্রবন্দরে সতর্কতা সৌদি প্রবাসীদের জন্য সরকারের ১৬ বিষয়ে জরুরি নির্দেশনা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে স্কেল নিয়ে চিঠি, স্মারক নম্বরে সাল ২০১৯ এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডার এখন ২০৬০ টাকা মৌমির সাফল্য পুরো সমাজের গর্ব: সিলেটের জেলা প্রশাসক মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত দেশকে অস্থির করতে চক্রান্ত চলছে: সিলেটে রিজভী

https://www.emjanews.com/

20218

sylhet

প্রকাশিত

০১ নভেম্বর ২০২৬ ২০:৫৫

সিলেট

মজুরি বন্ধ, চিকিৎসা-আবাসন সংকটে হবিগঞ্জের ১৫ হাজার চা-শ্রমিক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ২০:৫৫

ছবি: সংগৃহীত

টানা তিন সপ্তাহের মজুরি বকেয়া। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের এরিয়ার পাওনা, ৪৭ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ জমা না হওয়া এবং চিকিৎসা ও আবাসন সংকট। সব মিলিয়ে হবিগঞ্জে দেউন্দি টি কোম্পানির অধীন চারটি চা-বাগানের প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধসহ পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন চারটি চা-বাগানের শ্রমিকেরা। এর আগে নিজ নিজ বাগানে কর্মসূচি পালন করেও কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় তাঁরা জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হন। মানববন্ধন শেষে শ্রমিক নেতারা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দেন।

দেউন্দি টি কোম্পানির আওতাধীন দেউন্দি, লালচান্দ ও নোয়াপাড়া চা-বাগানের শ্রমিকেরা হবিগঞ্জে এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। অন্যদিকে, মিরতিঙ্গা চা-বাগানের শ্রমিকেরা তাঁদের মজুরি ও অন্যান্য দাবিদাওয়া জানিয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ন্যায্য পাওনা ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে মজুরি বন্ধ থাকায় শ্রমিক পরিবারগুলোর খাদ্য, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে শ্রমিকেরা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে তিন সপ্তাহের বকেয়া মজুরি ও এরিয়ার পাওনা পরিশোধ, প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ জমা, বাগানের চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের বাসস্থান ও ঘরবাড়ি সংস্কার।

স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, প্রত্যেক শ্রমিকের প্রায় ৪ হাজার টাকা করে এরিয়ার পাওনা রয়েছে। চারটি বাগানের প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিকের হিসাবে এ খাতে মোট বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

এ ছাড়া শ্রমিকদের মজুরি থেকে কর্তন করা অর্থ এবং মালিকপক্ষের নির্ধারিত অংশসহ ৪৭ মাসের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা জমা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে শ্রমিকেরা তাঁদের প্রাপ্য এই তহবিলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চিকিৎসাসেবা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে শ্রমিকদের। তাঁদের অভিযোগ, বাগানের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নেই। এতে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি শ্রমিকদের নতুন ঘর নির্মাণ, পুরোনো ঘরবাড়ি মেরামত এবং দরজা-জানালা ও ছাউনি সংস্কারের কাজও বন্ধ রয়েছে।

দেউন্দি টি কোম্পানির পঞ্চায়েত সভাপতি আপন সাঁওতাল বলেন, ২০২২ সাল থেকে শ্রমিকেরা তাঁদের ন্যায্য দাবিদাওয়া ও সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না। বর্তমানে কোম্পানির চারটি বাগানের শ্রমিকদের তিন সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রত্যেক শ্রমিকের প্রায় ৪ হাজার টাকা করে এরিয়ার পাওনা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থও যথাযথভাবে জমা দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, এসব দাবিতে প্রথমে নিজ নিজ বাগানে কর্মবিরতি পালন করা হয়। কিন্তু তাতেও কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় রোববার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করা হয়েছে। পরে পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ গণমাধ্যমকে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্রমিকদের ঘাম শুকানোর আগেই তাঁদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা প্রয়োজন। কী কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, দেউন্দি টি কোম্পানির ব্যবস্থাপক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় কোম্পানি আর্থিক সংকটে রয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ডে চা-বাগান ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত ঋণ বা ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। তবে কোম্পানি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। দ্রুত শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নোয়াপাড়া চা-বাগানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মো. সোহাগ আহমেদ বলেন, তিন সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকদের কাছে সময় চাওয়া হয়েছিল। কোম্পানি দ্রুত মজুরি পরিশোধের চেষ্টা করছে।

চা-শ্রমিকদের পঞ্চায়েতের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি কাউন্সিলর দুলাল ঘোষ বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

লালচান্দ চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মো. ফখরুল ইসলাম ফরিদী বলেন, অগ্নিকাণ্ডে বাগানের কারখানা পুড়ে যাওয়ার পর কোম্পানি আর্থিক সংকটে পড়ে। ২০১৮ সালের পর থেকে ব্যাংকঋণ পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তবে আর্থিক সংকটের মধ্যেও কোম্পানি শ্রমিকদের উৎসব বোনাস দিয়েছে। বর্তমানে তিন সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। ব্যাংকঋণ পাওয়া গেলে অথবা কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে ঋণের প্রয়োজন ছিল ৪২ থেকে ৪৫ কোটি টাকা। সময়ের ব্যবধানে এখন ঋণের চাহিদা অনেক বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংক বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করছে না।

দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা, প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ জমা না হওয়া এবং নিয়মিত মজুরি পরিশোধে অনিয়মের কারণে চারটি চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের দাবি, অন্যদিকে কোম্পানির আর্থিক সংকটের কথা- দুইয়ের মধ্যে আটকে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন শ্রমিক নেতারা।