ছবি: সংগৃহীত
মোঃ রুহুল আমিন:: ইসলামি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবান মুসলিম উম্মাহর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাস। এই মাসের মধ্যরাতে-১৪ শাবান দিবাগত রাত-পরিচিত শবে বরাত নামে। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। অর্থাৎ, এ রাত গুনাহ থেকে মুক্তি ও আল্লাহ তাআলার ক্ষমা লাভের এক মহিমান্বিত সুযোগ।
পবিত্র কুরআনে ‘শবে বরাত’ শব্দটি সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও সূরা আদ-দুখানের আয়াতসমূহকে কেন্দ্র করে তাফসিরবিদদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আমি তা নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী’(সূরা আদ-দুখান: ৩)।
এবং পরবর্তী আয়াতে এসেছে- ‘সে রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়’ (সূরা আদ-দুখান: ৪)।
হযরত ইকরিমা (রহ.)সহ কয়েকজন মুফাসসিরের মতে, এখানে উল্লিখিত ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ দ্বারা শবে বরাতকে বোঝানো হয়েছে। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এটি লাইলাতুল কদরের প্রতি ইঙ্গিত। এ ইখতিলাফ সত্ত্বেও শবে বরাতের ফজিলত ও গুরুত্ব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
হাদিসে শবে বরাতের মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- ‘শাবানের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসাকার ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন’ (ইবনে মাজাহ, তাবরানি)।
অন্য হাদিসে এসেছে- এই রাতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন; কিন্তু বিদ্বেষ পোষণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিরা এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে।
এ হাদিসগুলো প্রমাণ করে, শবে বরাত কেবল ইবাদতের রাত নয়; বরং অন্তর শুদ্ধ করার রাত।
অনেক আলেমের মতে, এ রাতে পরবর্তী এক বছরের রিজিক, হায়াত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। যদিও তাকদীরের চূড়ান্ত ফয়সালা লাইলাতুল কদরে সম্পন্ন হয়- শবে বরাতকে তাকদীর প্রস্তুতির রাত হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো- আত্মসমালোচনা ও আল্লাহমুখী হওয়া। এ রাতে নফল নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, তওবা-ইস্তিগফার, দরুদ পাঠ এবং আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা উত্তম। পরদিন ১৫ শাবানে নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব- বিশেষত যারা শাবান মাসে নিয়মিত নফল রোজা রাখেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শবে বরাত উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ বা নির্ধারিত রাকাআতের সংখ্যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
দুঃখজনকভাবে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে কিছু বিদআত ও অনৈসলামিক আচরণ সমাজে প্রচলিত হয়েছে। আতশবাজি, কবরকে কেন্দ্র করে উৎসব, আলোকসজ্জা কিংবা ভিত্তিহীন আমল ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। প্রকৃত শবে বরাত পালন মানে হলো- নীরবে, বিনয়ে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসা।
শবে বরাত কোনো উৎসবের রাত নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা ও তাকওয়া অর্জনের রাত। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ রাতকে ইবাদত ও অন্তরের সংশোধনের মাধ্যমে অতিবাহিত করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে তা আমলে পরিণত করার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক, সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল এন্ড কলেজ।
