ছবি: সংগৃহীত
সুনামগঞ্জ জেলার ১২ টি উপজেলার বিভিন্ন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে নানা ধরনের অপকৌশল করে টাকা আত্মসাৎ করার ফন্দি-কৌশলে মেতে উঠেছে একটি চক্র। ছাতক উপজেলায় ফায়দাবাজ চক্রটি মুল থেকেই বাঁধ নিয়ে কৃষক-কৃষি,ফসলের তোয়াক্কা না করে হরিলুটের পরিকল্পনা করে হাওরের ফসল রক্ষা বাধের টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে।
এতে উপজেলার ২৭ টি পিআইসির মধ্যের অধিকাংশ পিআইসির কাজ নিম্ন মানের অনেক পিআইসির বাধে ফাঁটল,বাঁধ ধবসে,যাচ্ছে, কয়েকটি প্রকল্পে শুধু টাকা উত্তোলনের জন্য পুরাতন বাঁধের উপর মাটির আস্তরণ দিয়ে রেডি করা হয়েছে। গত ক'দিন হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ দেখতে গিয়ে এসব চিত্র ফুটে উঠেছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
হাওর পাড়ের কৃষকরা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তারা হাওরের ফসল নিয়ে শংকিত। যারা বিগত অর্থ বছরে হাওরের বাঁধ নিয়ে অর্থ আত্মসাতে মেতা উঠেছিলো তারা অনেকেই চলতি অর্থ মৌসুমেও পিআইসি কমিটি ভাগিয়ে নিয়ে লুটপাট কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
ছাতকে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, মেরামতে পিআইসি গঠনের শুরুতেই অনিয়ম,একই ব্যাক্তি একাধিক কমিটিতে, অপরিকল্পিত পিআইসিতে অতিরিক্ত বরাদ্দ, অনেক বাঁধে এখনো করা হয় নি ড্রেসিং, দায়সারা বাঁধ নিয়ে আগাম বন্যায় ফসল হারনোর আশংকায় রয়েছেন কৃষকরা।
চলতি সনে দেখা গেছে উপজেলার হাওর রক্ষা বাঁধের পিআইসি গুলো নতুন করে গঠন না করে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের নিয়মেই বাঁধের কাজ শুরু করা হয়েছে।
ছাতক উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে হাওরের ফসল রক্ষায় ২৭ টি পিআইসি রয়েছে। এসব পিআইসিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মোট ২৯৯.৮৪ টাকা। স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করে বলেন, এখানের একাধিক পিআইসিতে দায়সারা ভাবে বাঁধের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে ও কাজ শেষ হয় নি।
জাউয়াবাজার ইউনিয়নের ডেকার হাওর ০.৩৮০ কিমি ডুবন্ত বাঁধের ভাঙা মেরামত, বরাদ্দ ২২ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা; ৫ নং পি আই সি. ১২৫ মিটার ডুবন্ত বাঁধ, বরাদ্দ ৪ লক্ষ ৯১ হাজার টাকা; ৮ নং পিআইসি বরাদ্দ ৮১ মিটার ডুবন্ত বাঁধ মেরামত, ৯ নং পিআইসি ৩৯৮ মিটার বাধের ভাঙা বন্ধকরণ, বরাদ্দ ১০ লক্ষ ৮৪ হাজার টাকা; পিআইসি-১৪, ৩৮৭ মিটার ডুবন্ত বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণ, বরাদ্ধ ১৯ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা; পি আই সি -১৫, ৩৮৫ মিটার ডুবন্ত বাধের ভাঙা মেরামত, বরাদ্দ ১৭ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা; পি আইসি-১৭, ডুবন্ত বাধ মেরামত ৪৬৬ মিটার, বরাদ্দ ১৪ লক্ষ ১০ হাজার টাকা; চরমহল্লা ইউনিয়ন, পিআইসি-১ বরাদ্দ ১৫ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা; পি আই সি -১২,৬৫৯ মিটার ডুবন্ত বাঁধ বরাদ্দ ১০ লক্ষ ৯৫ হাজার টাকা; পিআইসি-১০, ডুবন্ত বাঁধ ৫১ মিটার, বরাদ্দ ৪ লক্ষ ১ হাজার টাকা; খুরমা উত্তর ইউনিয়ন, পিআইসি-২৬, ২৫ মিটার ভাঙা বন্ধকরণ, বরাদ্দ ২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা।
এসব প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম- দুর্নীতি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে হাওরের ফসল রক্ষায় এখনো ব্যবস্থা গ্রহন প্রয়োজন।
এদিকে,খোজ নিয়ে জানা গেছে একাধিক পিআইসিতে রয়েছেন একই ব্যক্তি। ১, ৩ ও ১০ নং পিআইসিতে নারী-পুরুষসহ একই ব্যক্তি কোনটাতে সদস্য আবার কোনটাতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ।
১নং ও ১১নং পিআইসিতে বিগত সময়ের (পূর্বের) উপকারভোগী একজন ইউপি সদস্য রয়েছেন। ১৩নং ও ১৪ নং পিআইসিতে আরেক নারী সদস্যকে রাখা হয়েছে। এভাবে একই লোক দুইটি পিআইসির সদস্য বা সভাপতি করা হয়েছে শুধুমাত্র পরিকল্পিত লুটপাটের উদ্দেশ্যে। পিআইসিগুলোতে কৃষকদের তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
স্থানীয়দের ধারণা ১নং, ৭ নং ও ৮ নং পিআসিতে কাজের তুলনায় বরাদ্দ অতিরিক্ত দেয়া হয়েছে। বেশিরভাগ পিআইসি খন্ডখন্ড করা হয়েছে। এতে বুঝা যাচ্ছে না কোন এলাকার পি আই সি কোনটি। সময়মতো গণশুনানি না করা এবং পিআইসি গঠন না করায় এখানে এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে পিআইসিগুলো। বেশ কয়েকটি পিআইসিতে বরাদ্দের ৪০ভাগ টাকার কাজও করা হয়নি। কিন্তু পুরো বিল তুলে নিতে সক্রিয় সভাপতি-সেক্রেটারিরা।
একাধিক কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারী ২/৩ জন সাংবাদিককে এসব ব্যাপারে দোষারোপ করেছেন। একজন সভাপতি জানিয়েছেন, বিল উত্তোলনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছেন। বিষয়টি তিনি ইউএনও- কে অবহিত করেছেন।
এদিকে বৃষ্টিতে কোন কোন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। যার জন্য কিছু কিছু বাঁধ কেটে দেয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সৈদুজ্জামান নাহিদ জানান, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৯০% ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাধ নির্মাণ ও মেরামতের ব্যাপারে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডিপ্লোমেসি চাকমা জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের উপজেলা মনিটরিং কমিটি গঠন তার যোগদানের আগেই সম্পন্ন হয়েছে।যোগদানের পর থেকেই পিআইসিগুলোর কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন তিনি। প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সময় বাড়িয়েও দেয়া হয়েছে। এসব কাজে কোন ধরনের অনিয়ম দেখা দিলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলেও জানান ।
