ওসমানীনগরে থামছেই না চুরি-ছিনতাই
সকালে ৬ চোর আটক, বিকেলে আবার মোটরসাইকেল চুরি! জনতা ধরলেও ‘নীরব’ প্রশাসন, ক্ষোভ বাড়ছে জনমনে।
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ ২৩:১৩
ছবি: সংগৃহীত
সিলেটের ওসমানীনগরে কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনার। একের পর এক চুরির ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে প্রশাসনের ‘নীরব ভূমিকা’ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চোর ধরতে এখন পুলিশ নয়, সাধারণ জনতাকেই মাঠে নামতে হচ্ছে। তবে চোর ধরা পড়লেও কমছে না অপরাধের প্রকোপ। সকালে চোর আটকের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিকেলেই আবার চুরির ঘটনা ঘটছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে উপজেলার তাজপুর বাজারে চোর সন্দেহে ৬ জনকে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয় জনতা। পরে থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে আটককৃতদের থানা হেফাজতে নিয়ে যায়।
সকালে চোর আটকের এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিগত দিনে চুরির শিকার হওয়া ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ থানায় ভিড় করতে শুরু করেন। সকাল থেকেই ২০ থেকে ২৫ জন ভুক্তভোগী তাদের সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপি নিয়ে থানায় হাজির হন। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অনেকের ছিনতাই হওয়া মালামাল বা মোটরসাইকেলের সন্ধান মিলতে পারে এমন আশায় বুক বাঁধছেন তারা।
তবে এই স্বস্তির রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিকেলে তাজপুর বাজার এলাকা থেকেই আবারও একটি মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম জানান, বিকেলে তার একটি লাল রঙের মোটরসাইকেল (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: সিলেট হ- ১৩-৮৮৩৬) চুরি হয়ে যায়।
পরবর্তীতে তার বাসা সংলগ্ন ‘ফুলু মিয়া সাহেবের স’মিলের (করাতকল)’ সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়- মুখে মাস্ক, গায়ে চেক হাফ শার্ট এবং ফুল প্যান্ট পরা আনুমানিক ২৫-২৬ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত যুবক মোটরসাইকেলটি চালিয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অবগত করার কারণে থানায় অভিযোগ দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগী নজরুল।
ওসমানীনগরে মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নজরুল ইসলামের বাইক চুরির ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ গত সোমবার রাত ৮টার দিকে গ্রামতলা এলাকার ‘সালমা ভিলা’ থেকে গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের কাজী আব্দুল মুমিনের একটি লাল রঙের ‘হোন্ডা গ্ল্যামার’ মোটরসাইকেল চুরি হয়।
এর আগে, গত ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তাজপুর ইউনিয়নের ভাড়েরা গ্রামের রেহাদ আহমেদের প্রায় ৩ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি লাল রঙের ১৫০ সিসি ‘ইয়ামাহা এফজেড’ মোটরসাইকেল (রেজিস্ট্রেশন নম্বর: সিলেট মেট্রো-ল-১২-৫২০৯) চুরি হয়েছিল।
থানায় হাজির হওয়া ভুক্তভোগী রেহাদ আহমদ বলেন, ‘সকালে চোর আটকের খবর শুনে থানায় এসেছি। কিছুদিন আগে আমার তিন লাখ টাকার মোটরসাইকেলটি চুরি হয়েছিল। ভাবলাম, পুলিশ এদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো আমার বাইকটির কোনো সন্ধান মিলতে পারে।’
আটককৃতদের অনেকেই স্থানীয় বাসিন্দা বলে সনাক্ত করেছেন ভুক্তভোগীরা। গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের বাসিন্দা কাজী আব্দুল মুমিন বলেন, ‘সকালে চোর আটকের খবর পেয়ে আমি তাজপুর বাজারে গিয়েছিলাম এবং আটককৃতদের চিনতে পেরেছি। তারা আমাদের স্থানীয় বাসিন্দা। থানায় এসে ওসি সাহেবের সাথে কথা বলে সন্তোষজনক আশ্বাস পেয়েছি। আশা করি আমার সাইকেলটি পাবো।’
চোর ধরা প্রশাসনের কাজ, কিন্তু প্রশাসন পারছে না বলেই সাধারণ মানুষ ধরছে। আমাদের এলাকার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ- তাদের ছত্রছায়ায় যদি এমন কেউ থাকে, তবে যেন তাদের প্রশাসনের আওতায় আনা হয়।
জনতা কর্তৃক চোর আটক এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর সার্কেল) মনছুরা আক্তার বলেন, ‘জনতা চোর সন্দেহে কয়েকজনকে আটকে মারধর করেছিল, আমরা তাদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি। বর্তমানে তাদের যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এদের সাথে আর কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখে আইনের আওতায় আনা হবে।’
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে পাল্টা যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ যদি তথ্য নিয়ে আসে, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু কেউ যদি তথ্য না দেয় বা আমাদের কাছে তথ্য না থাকে, তাহলে তো আমাদের কিছু করার থাকে না।’
