শিরোনাম
ট্রিপল মার্ডার: প্রেম নয়, ছিল ‘চেনাজানা সম্পর্ক’ -এবার পুলিশের ভিন্ন সূর সিলেটে ট্রিপল মার্ডার: ঘাতক বাবুলকে জেল হাজতে প্রেরণ লঘুচাপের প্রভাবে সিলেটে টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস যুক্তরাজ্য থেকে ফিরে মর্গে ছুটে গেলেন দুই মেয়ে: দাফন আগামীকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে সরিয়ে নেয়া হলো সালাহউদ্দিনকে, এলেন এ্যানি যেভাবে একে একে ৩ জনকে খু/ন করে বাবুল: লোমহর্ষক বর্ণনা প্রেমের টানে দেখা করতে এসে তিন খুন, যেভাবে রহস্য উদঘাটন করলো পুলিশ সিলেটে তিন খুন: তছনছ বাসা-খোয়া গেছে কাগজপত্র, ১৯ আগস্ট আদালতে ছিল শুনানি রায়নগরের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় আটক এক রায়নগরের ট্রিপল মার্ডার: গৃহপরিচারিকা তাহমিনার প্রেমিকই খুনি!

https://www.emjanews.com/

17787

sylhet

প্রকাশিত

১৩ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৫৩

আপডেট

১৪ আগস্ট ২০২৬ ০০:১১

সিলেট

ট্রিপল মার্ডার: প্রেম নয়, ছিল ‘চেনাজানা সম্পর্ক’ -এবার পুলিশের ভিন্ন সূর

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ২৩:৫৩

নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম (ছবি: সংগৃহিত)

নানা প্রশ্নের মুখে পুলিশ তাদের আগের বক্তব্য থেকে সরে এসেছে। এবার বলছে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে ঘাতক বাবুল মিয়ার ‘চেনাজানা সম্পর্ক’ ছিল। যদিও আগে পুলিশ বলেছিলো ‘১৫/২০ দিনের একটা  রিলেশন ছিল এবং ফিজিক্যাল রিলেশন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। বাধা দেওয়ায় হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে বাবুল মিয়া ‘।

ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেন নিহত গৃহপরিচারিকা তাহমিনার বাবা, স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনজীবীসহ নেটিজেনরাও। শুধু প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে তিনজনকে হত্যা করার পুলিশের ব্যাখ্যা তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি তাদের।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রেম! বাবুল মিয়া যখন এই বাসায় রঙের কাজ করতো তখন এই মেয়েও এই বাসায় কাজ করতো। কাজ করতে গিয়ে তার সাথে একটি ‘চেনাজানা সম্পর্ক তৈরি হয়। তার হয়তো এমন কোনো ডিমান্ড ছিলো যা মেয়ে পূরণ করে নাই। সে আমাদের জানিয়েছে মেয়েটি বাবুল মিয়াকে ‘বাদ  কথা’ (বাজে কথা) বলেছে। যা তার ইগোতে লেগেছে। তার মানে সে অসম্মানিত হয়েছে। এর প্রতিশোধ নেওয়ার অংশ হিসেবে পরিকল্পনা মতো সে হয়তো ছুরি নিয়ে যায়। মেয়েটিকে অনেকগুলো ছুরিকাঘাত করেছে। রাগ থেকে গলাও কেটে ফেলেছে। 
সিআইডি, পিবিআই সহ আমরাও আলামত নিয়েছি। স্যোসাল মিডিয়ায় অনেকেই  অনেক কিছু বলছেন। তদন্ত যেভাবে করা দরকার আমরা সেটাই করবো।

সাইফুল ইসলাম, ‘বলেন আমরা ভিকটিমের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করেছি। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন তাদের আরও সদস্যরা আগামীকাল আসবেন। আসলে মামলা দায়ের করবেন। আমরা আসামীকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করেছি।’

বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নগরীর রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৫) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের (১৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় পুরো নগরজুড়ে শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে গৃহকর্মী তাহমিনার সম্মতিতে বাবুল মিয়া ওই বাসায় প্রবেশ করেন। পরে শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তাহমিনার সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাধে। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে হত্যা করেন। তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও হত্যা করা হয়। পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হয়।

বাবুল মিয়া জানায়, ‘প্রথমে সে তাহমিনাকে হত্যা করেছে। পরে সুরাইয়া বেগমকে হত্যা করে। তাদের লাশ ভিন্ন রুমে পাওয়া যায়। শেষে সে আব্দুস সত্তারকে হত্যা করেছে। তার লাশ ড্রয়িং রুমে পাওয়া যায়। যদি তাহমিনার চিৎকারে বাঁচাতে আসতেন তাহলে সবার লাশ এক জায়গায় পাওয়া যেতো। 

সিলেট বারের আইনজীবী মঈনুল হক বুলবুল ইমজা নিউজকে বলেন, রাগের মাথায় তাহমিনাকে হত্যা করে থাকলে সে তো নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারতো। অতীশীপর বৃদ্ধদেরকে হত্যা করার প্রয়োজন পরতো না। কারণ তাদেরকে আটকানোর ক্ষমতা তাদের ছিল না।

পৃথক ৩ রুমে লাশ পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেন বুলবুল। তিনি বলেন,‘ সবশেষে যাকে খুন করেছে উনার লাশ পাওয়া যায় ড্রয়িং রুমে। গৃহকত্রির লাশ পাওয়া যায় উনার বেডরুমের দরজায়। আর গৃহকর্মীর লাশ পাওয়া যায় তার রুমে। সবশেষে যাকে হত্যা করা হয়েছে তার লাশ কেনো এন্ট্রির রুমে।’

চাকুতে রক্তের দাগ মুছে ফেলছে তাহলে বাসার গ্রিলে কেনো রক্তের দাগ পাওয়া গেলো। কলিং বাজার সময় বিদ্যুৎ ছিল। তাহলে এন্ট্রির ফুটেজ গেলো কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন বলেন বুলবুল।

বৃহস্পতিবার তাহমিনার মরদেহ ময়নাতদন্ত করে গোসল শেষে অ্যাম্বুলেন্সে করে সুনামগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁর বাবা বলেন, তাঁর মেয়ে কখনো কোনো সমস্যার কথা জানায়নি। বরং সে জানিয়েছিল, রায়নগরের ওই বাসায় সে সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছে। তাহমিনার বাবা বলেন, ‘মেয়ের কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না।’ তার মেয়ের বয়সও ১২/১৩ বছর বলে জানান। একসময় সে লেখাপড়া করত। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। তাহমিনার বাবা জানান, মাত্র এক মাস ১২ দিন আগে গৃহকর্মী হিসেবে রায়নগরের ওই বাসায় কাজে যোগ দিয়েছিল তাহমিনা। তাঁর দাবি, তাহমিনা অত্যন্ত সহজ-সরল প্রকৃতির মেয়ে ছিল। এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর মেয়ে জড়িত থাকতে পারে- এমনটা তাঁরা বিশ্বাস করেন না।

‘ছোট মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক- বিশ্বাস করা কঠিন’পুলিশের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রায়নগরের মিতালী এলাকার ২৬ নম্বর বাসার বাসিন্দা মমিনুল হক। তিনি বলেন, তাহমিনাকে দেখে তাঁর কখনোই মনে হয়নি যে, ওই প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর কোনো প্রেমের সম্পর্ক থাকতে পারে। মমিনুল হক বলেন, ‘এত ছোট একটা মেয়ের সঙ্গে ওই বৃদ্ধের প্রেমের সম্পর্ক ছিল; এটা শোনার পর আমাদের কাছে বিষয়টি কেমন যেন সন্দেহজনক মনে হয়। যদি প্রেমের সম্পর্কই থাকে, তাহলে ছুরি নিয়ে কেন আসতে হবে? আর ছুরি নিয়ে এসে যদি মেয়েটিকে হত্যা করাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে বাসার কাগজপত্র তছনছ করা হলো কেন?’ তিনি আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে বাবুলকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় খালি হাতে দেখা গেছে বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁর প্রশ্ন, যদি ওয়ারড্রব তছনছ করা হয়ে থাকে, তাহলে স্বর্ণালংকার, টাকা-পয়সা বা মূল্যবান কোনো জিনিস নেওয়া হয়নি কেন? মমিনুল হক বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বর্ণালংকার তাদের জিম্মায় থাকার কথা বলা হয়েছে। আবার অভিযুক্ত ব্যক্তি বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাঁর শরীরে রক্তের কোনো দাগ ছিল না বলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন। এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আব্দুস সাত্তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর জমিজমা ও সম্পত্তি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সমস্যা ছিল বলে স্থানীয়ভাবে তাঁরা শুনেছেন। সিলেট মদনমোহন কলেজের সামনের জমি নিয়েও তাঁর অনেক ঝামেলা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি ওই এলাকায় তাঁর দুটি বাসা ছিল বলেও জানান মমিনুল। তাঁর ভাষ্য, ‘এখানে আরও অনেক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এ ব্যাপারে পুলিশ আরও ভালো জানবে। আমরা আশা করি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পুলিশ সব রহস্য উদঘাটন করবে।’ প্রকৃত আসামিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি। ‘সাধারণ প্রেমের ঘটনায় তিনটি হত্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়’

দুপুরে রায়নগরবাসীর উদ্যোগে নগরীর চৌহাট্টা শহিদ মিনারের সামনে মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।  

শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশ একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এখন এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান। 

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে একজন ব্যক্তি একাই চলে গেছে; এমনটা তাঁরা সহজে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাদের মতে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। বাসা থেকে জায়গা-জমি সংক্রান্ত দলিলপত্র হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনেছি। সেগুলো উদ্ধার করে এর সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করার দাবি বক্তাদের।