সিলেটে ৭ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ‘পিংক বাস’: প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ ১৭:১১
রাজধানী ঢাকায় নারীদের জন্য বিশেষায়িত ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালুর পর থেকেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিভাগীয় শহর সিলেটে নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার চিত্র। দীর্ঘ সাত বছর আগে সিলেটে নারীদের জন্য পৃথক বাস ও বিশেষ পরিবহন সেবা চালুর উচ্চপর্যায়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা আজও কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ একই সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঢাকায় এই সেবা চালু হওয়ায় সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আরও একবার হতাশায় রূপ নিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালের জুনের মাঝামা সময়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিআরটিএ এবং বিআরটিসি’র যৌথ আয়োজনে সিলেটে এক গণশুনানি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে নগরবাসীর তীব্র পরিবহন সংকট সমাধানের জন্য ‘নগর এক্সপ্রেস’ নামের একটি নতুন বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। সেই সময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, এই বাস সার্ভিসের অধীনে নারীদের জন্য পৃথক একাধিক বাস চলাচল করবে এবং সেগুলোর চালক ও সহকারীও থাকবেন নারীরা। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৪১টি বাস নিয়ে ‘নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস মালিক গ্রুপ’-এর পরিচালনায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেবা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু সূচনালগ্নে নারীদের জন্য পৃথক বাসের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। হাতে গোনা কয়েকটি বাস সীমিত পরিসরে চললেও পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
সময় গড়িয়েছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। সেই মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এখন মন্ত্রী। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন দেশত্যাগ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। বর্তমানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনে (সিসিক) কোনো নির্বাচিত মেয়র নেই; প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। ২০১৯ সালের সেই প্রতিশ্রুত প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রশাসক জানান, ওই উদ্যোগের বাস্তবায়ন না হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ তাঁর দপ্তরে সংরক্ষিত নেই। এমনকি এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। তবে সীমিত পরিসরে চলমান নগর এক্সপ্রেসের কার্যক্রম যদি ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবিত ও সম্প্রসারণ করা যায়, তবেই কেবল নারীদের জন্য পৃথক বাস চালার বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্পের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের সরাসরি প্রশাসনিক বা মালিকানার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার জানিয়েছেন, তিনি উদ্যোগটির কথা শুনেছেন বটে, তবে এর বিস্তারিত কোনো নথিপত্র বা তথ্য তাঁর কাছে নেই।
অন্যদিকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ উল্লাহ (সজিব) জানান, নগর এক্সপ্রেস কখনোই সিসিকের সরাসরি নিজস্ব কোনো প্রকল্প ছিল না। এটি পুরোপুরি একটি বেসরকারি উদ্যোগ ছিল। তিনি যোগদানের পর থেকে সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষের সাথে কোনো যোগাযোগ বা কাজের সুযোগ হয়নি উল্লেখ করে বলেন, নগর ভবনে তাদের একটি দপ্তর থাকলেও তা অনিয়মিতভাবে খোলা হয় এবং বর্তমানে বাস্তবে কয়টি বাস চালু রয়েছে বা তাদের কার্যক্রম কোন পর্যায়ে আছে, তার কোনো তথ্য যান্ত্রিক বিভাগের জানা নেই। তিনি আরো বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে নগর এক্সেপ্রেসের বাসগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। দেখলে মনে হয় ‘মুড়ির টিন’।
বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটে এই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ার পেছনে বেশ কিছু মূল কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রকল্পটিকে সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি বা মালিকপক্ষের খামখেয়ালির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এর পেছনে কোনো স্থায়ী সরকারি বা সিটি কর্পোরেশনের তদারকি ছিল না। দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট রুট পারমিট, ভর্তুকি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকায় বাস মালিকরা লোকসানের মুখে পড়ে ধীরে ধীরে সেবা গুটিয়ে নেন। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের ধাক্কা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় পুরো প্রকল্পটি ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে। এছাড়া কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অবর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নিয়মিত ফলোআপের অভাবের কারণে এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছে।
অন্যদিকে, ঠিক যখন সিলেটে নারীদের জন্য একটি পৃথক বাস চালুর স্বপ্ন সাত বছরেও অধরা রয়ে গেছে, ঠিক তখনই গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও বাস ডিপোতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে বিশেষ ‘পিংক বাস’ সার্ভিস। ঢাকার এই বাসে যাত্রী, চালক এবং কন্ডাক্টর- সবাই নারী। ঠিক যেমনটি ২০১৯ সালে আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো সিলেটবাসীকে।
সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার বাসিন্দা পারভিন শিকদার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। যাতায়াতের দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের যাতায়াতের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাই একমাত্র ভরসা। নগর এক্সপ্রেস বাস সার্ভিসটি যদি পুরোপুরি চালু থাকত এবং সেখানে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকত, তবে তা আমাদের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ও নিরাপদ হতো। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য প্রথমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং পরে রিকশা বদল করতে হয়, এতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। অথচ নিয়মিত বাস সার্ভিস চালু থাকলে যাতায়াত খরচ যেমন কমত, তেমনি ভোগান্তিও অনেকাংশে লাঘব হতো।
শুধু পারভিন শিকদার নয় সিলেটের অনেক কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক বাস সার্ভিস এখন সময়ের দাবি। তুলনামূলক ছোট শহর হওয়া সত্ত্বেও সিলেটে নারীদের যাতায়াতের করুণ দশা ও সিটি বাসের অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তাছাড়া নগর এক্সপ্রেস পুরোদমে চালু করা গেলে তা নগরীর যানজট নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। তাই সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, নামমাত্র বা দায়সারা ঘোষণা নয়; বরং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও সঠিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলে নারীদের জন্য নিরাপদ পৃথক গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
