ছবি: সংগৃহীত
কাদা, পানি আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে কত স্বপ্ন, কত সংসার। কোথাও ভেঙে পড়েছে ঘর, কোথাও নিশ্চিহ্ন হয়েছে রাস্তা। প্রিয়জনকে খুঁজতে ধ্বংসস্তূপের দিকে ছুটছেন স্বজনেরা। চারদিকে শুধু হাহাকার আর অপেক্ষা, কখন মিলবে হারিয়ে যাওয়া মানুষটির খোঁজ। এরই মধ্যে ধ্বংসের সেই স্রোত ভেসে নিয়ে এলো একটি মরদেহ।
স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ছুটে আসার কথা উদ্ধারকারীদের। মৃত মানুষটির শেষ সম্মানটুকু নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু সেই দৃশ্যই যেন মানবিকতার এক নির্মম প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল। মরদেহ উদ্ধারের বদলে সেটিকে ঘিরে তৈরি হলো মানুষের ভিড়। আর সেই ভিড়ের মধ্য থেকেই এক যুবক হাত বাড়িয়ে দিলেন মৃতের কানের দিকে। উদ্দেশ্য, সোনার দুল খুলে নেওয়া। নেপালে কাদায় পড়ে থাকা মরদেহ থেকে গয়না খুলে নিয়ে গেছে। ভিডিও ভাইরাল হতেই দুজন গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
একটি দুল খুলে নেওয়ার পর মৃতের চুল ধরে মাথা ঘুরিয়ে অন্য কান থেকেও দুলটি খুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায় তাকে। আশপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরও অনেকে। অথচ কেউ তাকে থামালেন না।
একদিকে প্রকৃতির ভয়াবহতা মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই যেন প্রকাশ পেল মানুষের আরেক নির্মম মুখ।
ফ্লাশ ফ্লাড হয়তো মুহূর্তে একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু একজন মৃত মানুষের শরীর থেকেও শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেওয়ার এই দৃশ্য শুধু একটি লুটের ঘটনা নয়; এটি বিবেকের কাছেও এক কঠিন প্রশ্ন। যে মানুষটি হয়তো কোনো একদিন স্বজনের হাত ধরে হেসেছিলেন, কারও মা ছিলেন, কারও বোন, কারও স্ত্রী কিংবা প্রিয় মানুষ; আজ তিনি নিথর। তার আর কিছু চাওয়ার নেই। ছিল শুধু একটু সম্মান পাওয়ার অধিকার।
প্রকৃতির কাছে মানুষ কখনো কখনো অসহায়। কিন্তু মানুষের বিপর্যয়ের মুহূর্তে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়; এই বিশ্বাসেই তো সভ্যতার জন্ম। নেপালের সেই বিধ্বস্ত জনপদে উদ্ধারকারীরা যখন জীবন খুঁজছেন ধ্বংসস্তূপের নিচে, তখন ভাইরাল হওয়া এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়; প্রকৃতির দুর্যোগ মানুষকে অসহায় করতে পারে, কিন্তু মানবিকতার মৃত্যু যেন মানুষের হাতে না হয়।
হড়পা বানের পানি হয়তো একসময় নেমে যাবে। ধ্বংসস্তূপ সরবে, রাস্তা আবার তৈরি হবে, জনপদও একদিন ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু মানুষের বিবেকের ওপর যে দাগ পড়ে গেল; সেটি কি এত সহজে মুছে যাবে?
