শিরোনাম
‘যেমন-তেমনে’ কর্মী পাঠানো যাবে না মালয়েশিয়ায়: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ৩০ ব্যাংকের সেবা দ্রুত সচলের নির্দেশ বিদেশে কর্মী পাঠাতে সিন্ডিকেটের দিন শেষ: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ, সিলেটে বাড়তে পারে বৃষ্টি-বজ্রবৃষ্টি অবশেষে দশম গ্রেডে বেতন পাবেন প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকরা সিলেটসহ দেশের সব হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ জেলা স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন করতে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে: সিলেটে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সিলেটে পুলিশের অভিযানে ৩৩ জন গ্রেফ/তার আগাম ঘোষণা ছাড়াই ৩০ ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, বিপাকে গ্রাহক বিদায় নিচ্ছে মৌসুমি বায়ু: সিলেটে মিললো যে পূর্বাভাস

https://www.emjanews.com/

19365

international

প্রকাশিত

০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০১

আন্তর্জাতিক

লাওসে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোয় স্থগিতাদেশ, বাড়ছে কাগজপত্র যাচাই

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০১

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশি নাগরিকদের নতুন করে নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু চার মাসের জন্য স্থগিত করেছে লাওস। অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার ও অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহ ঠেকাতে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ থাকায় দেশটির শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ জানতে লাওসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার; পাশাপাশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভুয়া চাহিদাপত্র ও প্রতারণা ঠেকাতে কাগজপত্র যাচাইয়ে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।

আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকায় লাওসের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। একই সঙ্গে ভুয়া চাহিদাপত্র, অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি ও প্রতারণা ঠেকাতে লাওসে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাই আরও কঠোর করা হয়েছে।

গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসের জন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট এবং শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু স্থগিত রেখেছে লাওস।

লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৯ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনার বরাত দিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত ২৮ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য শ্রমিক শ্রেণির এলএ-বি২ ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও জানানো হয়।

তবে বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি লাওস সরকার।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, স্থগিতাদেশের কারণ জানতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লাওসে বাংলাদেশের নিজস্ব দূতাবাস না থাকায় পাশের দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি জানার চেষ্টা চলছে।

একই সঙ্গে লাওসের শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা রয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, লাওসের বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন।

তার ধারণা, দেশটির অনেক প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় নতুন শ্রমিকের চাহিদাও কমে থাকতে পারে। সেই কারণেও সাময়িকভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার স্থগিত করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে এটি এখনো নিশ্চিত নয়। স্থগিতাদেশের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে লাওস সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।

লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বরাত দিয়ে ১৪ সেপ্টেম্বর ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমস’ জানিয়েছে, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহ এবং বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার পর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে কেন সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে লাওসের শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।

নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগদাতা বা লেবার অপারেটর নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশি নাগরিকদের লাওসে প্রবেশ বা কর্মসংস্থানের অনুমতি দিতে পারবেন না।

এর ফলে নতুন করে বাংলাদেশি কর্মীদের ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া, শ্রমিক আমদানির পরিকল্পনা এবং শ্রম প্রকল্পের অনুমোদনও স্থগিত থাকবে।

তবে লাওস সরকারের অনুমোদিত বড় অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প, যেসব প্রকল্পের কাজের সময়সূচি চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত রয়েছে, সেগুলো এই স্থগিতাদেশের আওতামুক্ত থাকবে বলে ‘দ্য লাওসিয়ান টাইমস’-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লাওসের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারও দেশটিতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া ভিসা, ভুয়া চাহিদাপত্র এবং অননুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারণার শিকার না হতে কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাওসে যাওয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না দিতে এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করতে বাংলাদেশি কর্মীদের অনুরোধ করা হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা প্রতারণার শিকার হওয়ায় এসব দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কাগজপত্র আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, একজন কর্মী কী কাজের জন্য যাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন এবং কতদিনের জন্য যাচ্ছেন—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও আগের তুলনায় আরও সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ভুয়া কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে লাওসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠিয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কর্মীরা দেখতে পেয়েছেন, চাহিদাপত্রে উল্লেখ করা ধরনের প্রকৃত কাজ বা কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে তারা নানা সমস্যায় পড়েছেন।

লাওস সরকারের নতুন নির্দেশনায় অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশি শ্রমিক আনা বা নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতাদের জন্য আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক আনা বা নিয়োগ করলে প্রতিটি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে। অন্য কোনো শ্রমিক ইউনিটে নিয়োগের জন্য শ্রমিক আনা হলেও একই জরিমানার বিধান রয়েছে।

অন্য শ্রমিক ইউনিটের জন্য নির্ধারিত কোনো শ্রমিককে কাজে ব্যবহার বা গ্রহণ করলে নিয়োগদাতাকে প্রতিটি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২০ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ৮৯ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে।

এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া অননুমোদিত কর্মস্থলে কাজ করলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে প্রতিটি ঘটনায় ১০ লাখ লাও কিপ বা প্রায় ৪৪ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হবে। একই সঙ্গে তাকে ৩০ দিনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।

কোনো কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যাতায়াতসহ সব খরচ নিয়োগদাতা অথবা আইন ভঙ্গকারী পক্ষকে বহন করতে হবে।

একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ করার পাশাপাশি অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে বলে লাওস সরকারের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএমইটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে লাওসে যাওয়া কর্মীদের বড় একটি অংশ নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করেন।

তবে বর্তমানে লাওসে ঠিক কতজন বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেননি প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।

একটি বাংলাদেশি সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মী অভিবাসনের তালিকায় লাওসের অবস্থান ১৩তম।

এর আগে ২০২৫ সালে তিন হাজার ৮৩৫ জন বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য লাওস বড় কোনো শ্রমবাজার নয়। দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়। সেখানে মূলত কিছু চীনা প্রকল্পে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করতে যান।

লাওসে বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যুর ওপর আরোপিত স্থগিতাদেশ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে এরপর দেশটির শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবার খুলে দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে লাওসের শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, স্থগিতাদেশের কারণ এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা থাকবে; এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার একই সঙ্গে লাওস, কম্বোডিয়া ও অন্যান্য দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কাগজপত্র যাচাই এবং কর্মীদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

শুধু লাওস নয়, অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতেও সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।

বিশেষ করে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়া, সার্বিয়া হয়ে ইউরোপে প্রবেশ এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার মতো প্রবণতা বন্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

লাওসের ক্ষেত্রে বর্তমান স্থগিতাদেশ একদিকে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিরতি তৈরি করেছে, অন্যদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণার ঝুঁকিও নতুন করে সামনে এনেছে।

ভুয়া চাহিদাপত্র, অননুমোদিত রিক্রুটিং এবং অস্তিত্বহীন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিতে যাতে কেউ বিদেশে গিয়ে বিপদে না পড়েন, সে জন্য কর্মীদের যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনি রিক্রুটিং প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সরকারি যাচাই আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।