বিলেতে বাংলা সংবাদপত্রের শতবর্ষের ইতিহাস সংরক্ষণে ইস্টহ্যান্ডসের উদ্যোগ
১২ মাসের গবেষণা প্রকল্পে বই, ডিজিটাল আর্কাইভ ও প্রামাণ্যচিত্র; সংরক্ষিত হবে প্রবীণ সাংবাদিক ও পাঠকদের স্মৃতিও
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ২০:১২
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্যে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার শতবর্ষের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ১২ মাসব্যাপী গবেষণা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রকল্প ঘোষণা করেছে দাতব্য সংস্থা ইস্টহ্যান্ডস। দ্য ন্যাশনাল লটারি হেরিটেজ ফান্ডের সহায়তা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী অংশীদারদের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ, বিনামূল্যে উন্মুক্ত ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং প্রবীণ সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও পাঠকদের স্মৃতি সংরক্ষণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
ইস্টহ্যান্ডসের চেয়ারম্যান নবাব উদ্দিনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে প্রকল্পের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্থাটির ঐতিহ্য ও গবেষণা সমন্বয়কারী সাঈম চৌধুরী। প্রকল্প ব্যবস্থাপক আ স ম মাসুম ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। আয়োজকেরা জানান, গবেষণার ফলাফল ও সংগৃহীত ঐতিহাসিক উপকরণ টাওয়ার হ্যামলেটসের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যুক্তরাজ্যে বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ‘সত্যবাণী’কে এ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শত বছরেরও বেশি সময় ধরে বিলেতের বাংলা সংবাদপত্র প্রবাসী বাঙালিদের অভিবাসন, অধিকার আদায়ের আন্দোলন, বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাস ধারণ করে আসছে। প্রবাসী বাঙালিদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও এসব সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এই সমৃদ্ধ ইতিহাসের বহু মূল্যবান উপকরণ বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছড়িয়ে রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে পুরোনো সংবাদপত্র, ছবি, চিঠি, নথি ও অন্যান্য ঐতিহাসিক দলিল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি প্রবীণ সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও পাঠকদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও হারিয়ে যেতে পারে।
এই ঐতিহাসিক উপকরণ সংগ্রহ, যাচাই, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের মাধ্যমে বিলেতে বাংলা সাংবাদিকতার ধারাবাহিক ইতিহাস নির্মাণই প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আ স ম মাসুম জানান, ছয়টি প্রধান কার্যক্রমের মাধ্যমে ১২ মাসের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রথমত, গবেষণালব্ধ তথ্য ও ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে বিলেতে বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস নিয়ে একটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করা হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা হবে।
তৃতীয়ত, বাংলা গণমাধ্যমের অগ্রদূত, প্রবীণ সম্পাদক ও প্রকাশকদের জীবনসংগ্রাম এবং অবদান নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হবে। চতুর্থত, প্রবীণ সাংবাদিক, সম্পাদক, প্রকাশক ও পাঠকদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি মৌখিক ইতিহাস হিসেবে রেকর্ড করা হবে।
পঞ্চমত, সংগৃহীত ঐতিহাসিক নথিপত্র স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য টাওয়ার হ্যামলেটস লোকাল হিস্ট্রি লাইব্রেরি অ্যান্ড আর্কাইভসে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ষষ্ঠত, গবেষণার ফলাফল ও সংগৃহীত ঐতিহাসিক উপকরণ জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে লন্ডন ও বার্মিংহামে দুটি প্রদর্শনী এবং ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইস্টহ্যান্ডসের ট্রাস্টি বাবলুল হক। প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশা, বিবিসির সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি তারেক চৌধুরী, সাংবাদিক মাহবুব রহমান, প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ জুবায়ের, ‘দেশ’ সম্পাদক তাইসির মাহমুদ, কবি ও ভ্রমণকাহিনিলেখক দিলু নাসের এবং প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হক।
প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে পরামর্শ ও মতামত দেন সাংবাদিক রহমত আলী, আজিজুল আম্বিয়া, আফজাল হোসেন, আলাউর রহমান শাহীন, এনাম চৌধুরী, সাজু আহমেদ ও জয়নাল আবেদীন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইস্টহ্যান্ডসের স্বেচ্ছাসেবী আহাদ চৌধুরী বাবু ও মোহাম্মদ কিনু।
আয়োজকেরা বলেন, ডিজিটাল গণমাধ্যম ও মোবাইল সাংবাদিকতার প্রসারের এই সময়ে বিলেতে বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাস সংরক্ষণ প্রবাসী বাঙালি কমিউনিটির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক স্মৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের সংগ্রাম, অর্জন ও সাংবাদিকতার বিকাশ সম্পর্কে জানতে পারবে।
প্রকল্পের গবেষণা, ঐতিহাসিক উপকরণ সংগ্রহ, আর্কাইভ সংরক্ষণ ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইস্টহ্যান্ডস। একই সঙ্গে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে থাকা পুরোনো বাংলা সংবাদপত্র, ছবি, চিঠি, প্রকাশনাসংক্রান্ত নথি কিংবা গবেষণায় সহায়ক অন্য কোনো ঐতিহাসিক উপকরণ দিয়ে সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, সম্মিলিত উদ্যোগে বিলেতে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস সংরক্ষিত হবে এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ হয়ে উঠবে।
