প্রাঞ্জলি আওয়াস্তি (ছবি: সংগৃহীত)
যে বয়সে অনেক কিশোরী কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেয়, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিলস তৈরি করে, সেই বয়সেই প্রযুক্তির দুনিয়ায় নিজের স্বপ্নের ভিত গড়ে তুলেছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাঞ্জলি আওয়াস্তি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্টার্টআপ গড়ে তুলে আলোচনায় আসেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত Delv.AI-এর মূল্যায়ন একসময় দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারে।
প্রাঞ্জলির গল্প কেবল অর্থমূল্যের হিসাব কিংবা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কাহিনি নয়। এটি কৌতূহলকে সাহসে রূপ দেওয়ার, ছোটবেলার আগ্রহকে বড় স্বপ্নে পরিণত করার এবং প্রচলিত ধারণার গণ্ডি পেরিয়ে নিজের পথ তৈরি করার এক অনুপ্রেরণামূলক আখ্যান।
বাবার হাত ধরে কোডিংয়ের জগতে
প্রাঞ্জলির সাফল্যের বীজ বোনা হয়েছিল শৈশবেই। মাত্র সাত বছর বয়সে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার বাবা মেয়ের মধ্যে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে কোডিং শেখাতেন। বাবার কাছ থেকেই ধীরে ধীরে কম্পিউটারের ভাষা বুঝতে শেখেন প্রাঞ্জলি।
শৈশবের সেই দিনগুলোতে কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে ওঠা কোডের সারি তাঁর কাছে নিছক কিছু অক্ষর কিংবা নির্দেশনা ছিল না; বরং সেগুলো ছিল নতুন কিছু তৈরি করার সম্ভাবনার দরজা। কৌতূহলী মন নিয়ে সেই দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তেই প্রযুক্তির জগৎ তাঁর কাছে হয়ে ওঠে পরিচিত ও আপন।
একজন অভিভাবকের উৎসাহ যে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, প্রাঞ্জলির জীবন তারই একটি উদাহরণ। বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তাঁকে শুধু কোডিং শেখায়নি, বরং সমস্যা দেখলে তার সমাধান খোঁজার মানসিকতাও তৈরি করেছে।
গবেষণার সমস্যা থেকেই নতুন উদ্যোগের ভাবনা
পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বেড়ে ওঠা প্রাঞ্জলি অল্প বয়সেই প্রযুক্তি ও গবেষণার বাস্তব জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। ১৩ বছর বয়সে Florida International University-তে গবেষণাসংশ্লিষ্ট কাজে ইন্টার্নশিপ করার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তার জগতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
সেখানে তিনি উপলব্ধি করেন, গবেষকদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তথ্যের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা। তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের বিশাল ভান্ডার থেকে নির্ভরযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক উপাদান বেছে নেওয়াই অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এই সমস্যাই তাঁর মনে নতুন একটি ধারণার জন্ম দেয়। যদি এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা যায়, যা বিপুল তথ্যের ভিড় থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান খুঁজে বের করবে, সেগুলো সাজাবে এবং সংক্ষেপে উপস্থাপন করবে, তাহলে গবেষণার কাজ অনেক সহজ হয়ে উঠতে পারে।
একটি বাস্তব সমস্যাকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগে রূপ দেওয়ার এই চিন্তা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় তাঁর স্টার্টআপের পরিকল্পনা।
Delv.AI: তথ্যের জট খুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
২০২২ সালে প্রাঞ্জলি Delv.AI প্রতিষ্ঠা করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য ছিল গবেষকদের তথ্য অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের কাজ সহজ করা। বিপুল পরিমাণ ডেটা থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য খুঁজে বের করা, প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করা এবং সেগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপনের মতো কাজে সহায়তা করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
আজকের তথ্যনির্ভর পৃথিবীতে সময়ের মূল্য অনেক। গবেষক কিংবা পেশাজীবীদের প্রতিনিয়ত অসংখ্য নথি, প্রতিবেদন ও অনলাইন উৎস ঘেঁটে কাজ করতে হয়। সেই সময় ও শ্রম বাঁচানোর সম্ভাবনাই Delv.AI-কে একটি আগ্রহজাগানিয়া উদ্যোগে পরিণত করে।
তবে প্রযুক্তির জগতে নতুন ধারণা নিয়ে আসাই শেষ কথা নয়। সেই ধারণাকে বাস্তব পণ্যে রূপ দেওয়া, ব্যবহারকারীর প্রয়োজন বোঝা এবং একটি কার্যকর ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাঞ্জলির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার যাত্রায় এই চ্যালেঞ্জগুলোও ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কয়েক কোটি টাকার বিনিয়োগ, শতকোটি টাকার মূল্যায়ন
২০২৩ সালে Miami Tech Week-এ অংশ নিয়ে প্রাঞ্জলি তাঁর উদ্যোগের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ সংগ্রহের খবরের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন। সে সময় Delv.AI-এর মূল্যায়ন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
একজন কিশোরী উদ্যোক্তার জন্য এমন বিনিয়োগ ও মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য অর্জন। তবে কোম্পানির মূল্যায়ন আর উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত সম্পদ এক বিষয় নয়। মূল্যায়ন বলতে বিনিয়োগকারীদের বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বাজারমূল্য বোঝায়; এটি সরাসরি প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ নির্দেশ করে না।
প্রাঞ্জলির অর্জনের তাৎপর্য এখানেই যে, তিনি কেবল একটি ধারণা নিয়ে থেমে থাকেননি। সেই ধারণাকে ব্যবসায়িক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও আকর্ষণ করেছেন।
সাফল্যের আড়ালে নেতৃত্বের কঠিন পাঠ
একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা মানে শুধু প্রযুক্তি তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দল পরিচালনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সবাইকে একই লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার কাজ। অল্প বয়সে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রাঞ্জলিকেও এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দল পরিচালনা এবং সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত রাখার বিষয়টি তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে। বয়সে ছোট হয়েও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের সঙ্গে কাজ করা সহজ নয়। সেখানে নিজের চিন্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা, অন্যের মতামত শোনা এবং দলকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস।
প্রাঞ্জলির গল্পের এই দিকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাফল্যকে বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে মনে হয়, তার পেছনে থাকে অসংখ্য সিদ্ধান্ত, অনিশ্চয়তা, শেখার অভিজ্ঞতা এবং ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা।
নতুন প্রযুক্তির পথে নতুন স্বপ্ন
প্রাঞ্জলিকে ঘিরে আলোচনার আরেকটি বিষয় হলো তাঁর পরবর্তী প্রযুক্তি উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহ। এআই এজেন্ট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সহকারীর ধারণা এখন প্রযুক্তি খাতের অন্যতম আলোচিত ক্ষেত্র। এসব ব্যবস্থা শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতেও সক্ষম হতে পারে।
তবে তাঁর পরবর্তী উদ্যোগ, এর বর্তমান অবস্থা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সাম্প্রতিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় কোনো প্রকল্পের পরিকল্পনা, পরীক্ষামূলক পর্যায় ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
প্রাঞ্জলির ভবিষ্যৎ পথচলা তাই কেবল তাঁর আগের সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে না; বরং নতুন সমস্যার সমাধান খোঁজা, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো এবং উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।
বয়স নয়, স্বপ্ন দেখার সাহসই বড়
প্রাঞ্জলি আওয়াস্তির জীবনকাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভা বিকাশের জন্য কেবল বয়সের একটি নির্দিষ্ট সীমা কিংবা প্রচলিত কোনো ছকে বাঁধা পথই একমাত্র উপায় নয়। কখনো কখনো ছোটবেলার একটি কৌতূহলই ভবিষ্যতের বড় উদ্যোগের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন শিক্ষা, অনুশীলন, পরিশ্রম, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং প্রতিনিয়ত শেখার মানসিকতা।
তাঁর গল্পের সবচেয়ে মূল্যবান দিক শুধু কোটি টাকার মূল্যায়ন নয়, বরং একটি সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধান খোঁজার চেষ্টা। বাবার কাছ থেকে কোডিং শেখার ছোট্ট অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণার জটিলতা বোঝা, সেখান থেকে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ; প্রতিটি ধাপই দেখায়, বড় স্বপ্নের শুরু অনেক সময় হয় খুব ছোট কোনো পদক্ষেপ থেকে।
যে সমাজে এখনো অনেক মেয়েকে প্রযুক্তি, নেতৃত্ব কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে নানা সংশয় ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়, সেখানে প্রাঞ্জলির পথচলা নতুন সম্ভাবনার কথা বলে। তাঁর গল্প কোনো রাতারাতি সাফল্যের রূপকথা নয়; বরং কৌতূহল, সুযোগ, পারিবারিক উৎসাহ এবং নিরলস চেষ্টার সম্মিলিত ফল।
শেষ পর্যন্ত, সাফল্যের প্রকৃত অর্থ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক মূল্যায়নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং নিজের ভাবনাকে কাজে পরিণত করা, নতুন কিছু শেখা এবং অন্যদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার মধ্যেও সাফল্যের গভীর তাৎপর্য লুকিয়ে থাকে।
সাত বছর বয়সে কোডিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সেই শিশুটির গল্প তাই আমাদের সামনে একটি সহজ অথচ শক্তিশালী বার্তা তুলে ধরে; স্বপ্নের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। প্রয়োজন কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখা, শেখার সাহস অর্জন করা এবং সুযোগ এলে নিজের সামর্থ্য দিয়ে তার সদ্ব্যবহার করা।
