ছবি: সংগৃহীত
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনার লক্ষ্যে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬–২০২৭ (সিজন–২)’-এর বাছাই কার্যক্রমের প্রথম দিনেই সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা মাঠে উপস্থিত হলেও আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিনিধিদের না পেয়ে অনেককে ফিরে যেতে হয়েছে। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮টিতে নির্ধারিত দিনে বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে জেলা ক্রীড়া অফিস বলছে, সমন্বয়গত কিছু সমস্যার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও ২ নভেম্বরের মধ্যে বাছাই ও দল গঠনের কাজ শেষ করার সুযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের গৌরারং ফুটবল মাঠে ১০টি ইভেন্টে খেলোয়াড় বাছাইয়ের কথা ছিল। ইভেন্টগুলো হলো অ্যাথলেটিক্স, কাবাডি, ক্রিকেট, টেবিল টেনিস, দাবা, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, মার্শাল আর্ট ও সাঁতার।
নির্ধারিত সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা মাঠে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে কোনো আয়োজক বা সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর অংশগ্রহণকারীরা নিজ নিজ বিদ্যালয়ে ফিরে যান।
গৌরারং ইউনিয়নের প্রতিযোগিতা কমিটির সদস্য সচিব ও হাজী আব্দুস সাত্তার এন্ড মরিয়ম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “আমি নিজেই এই কমিটির সদস্য সচিব, অথচ কীভাবে কী করতে হবে, তা জানি না। কেউ আমাদের কিছু জানায়নি। কোনো সভা বা প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও হয়নি।”
তিনি অভিযোগ করেন, নতুন ওয়েবসাইটে কমিটির সদস্যদের নাম ও ফোন নম্বর দেওয়া হলেও বাছাই কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতি, দায়িত্ব কিংবা প্রস্তুতি সম্পর্কে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হয়নি।
হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, গৌরারংয়ের পাশাপাশি কাঠইরসহ অন্যান্য ইউনিয়নেও একই ধরনের সমস্যার খবর পেয়েছেন তিনি। প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের অভাবে শিক্ষার্থীদের মাঠে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে।
পুরান লক্ষণশ্রী গুচ্ছগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আতাউর রহমান তালুকদার জানান, প্রতিযোগিতার নির্ধারিত সময় ও ভেন্যুর তথ্য অনুযায়ী তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে গৌরারং মাঠে উপস্থিত হন। তাঁর বিদ্যালয়সহ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সেখানে এসেছিল। কিন্তু মাঠে কোনো আয়োজক বা ক্রীড়া কমিটির সদস্যকে পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সদস্য সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেও প্রতিযোগিতার আয়োজন সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। জানিগাঁওয়ের মতো অন্য ভেন্যুতেও প্রস্তুতি বা কমিটির উপস্থিতি না থাকার কথা জানতে পেরেছেন তিনি।
আতাউর রহমান তালুকদার বলেন, জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিযোগিতায় মাঠপর্যায়ে আয়োজক বা কমিটির প্রতিনিধিদের উপস্থিতি না থাকায় শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বিভ্রান্ত ও বিব্রত হয়েছেন। কোনো প্রস্তুতি ছাড়া কেন শিক্ষার্থীদের মাঠে আনা হলো, তা নিয়ে অভিভাবকেরা প্রশ্ন তুলেছেন।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও সদস্য সচিবদের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে মঙ্গলবার কেবল মোল্লাপাড়া ইউনিয়নে বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অন্য ইউনিয়নগুলোতে নির্দেশনার অভাব, প্রস্তুতির ঘাটতি কিংবা নতুন করে সময়সূচি নির্ধারণের কারণে কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।
আফতাবনগর ইউনিয়নে আগামী ২৯ ও ৩১ অক্টোবর এবং ১ নভেম্বর ব্রাহ্মণগাঁও খেলার মাঠে প্রতিযোগিতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইউনিয়নটির মাইজবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান তহুর জানান, কমিটির বৈঠকে তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নোটিশ ও খুদে বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হবে। নিবন্ধিত খেলোয়াড়দের পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা অন্য শিক্ষার্থীরাও খেলতে পারবে।
জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে মঙ্গলবার বিভিন্ন ইভেন্টের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মঙ্গলকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জ থেকে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও ক্রীড়া কর্মকর্তার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাঁরা আসতে পারেননি। বুধবার থেকে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে মূল প্রতিযোগিতা শুরুর কথা রয়েছে।
মোহনপুর ইউনিয়নে মঈন উল হক কলেজ মাঠে সকাল ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো শিক্ষার্থী আসেনি বলে জানান জয়নগরবাজার হাজী গনিবক্স উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. লিলু মিয়া চৌধুরী। পরে ইউনিয়নের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুধবার বেলা ১১টা থেকে বাছাই শুরুর কথা জানতে পারেন তাঁরা। এদিন প্রতিযোগিতার ব্যানার তৈরির অর্ডারও দেওয়া হয়েছে।
রঙ্গারচর ইউনিয়নে আগামী রবিবার থেকে বিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রতিযোগিতা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চৌদ্দগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও প্রতিযোগিতার সদস্য সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাইয়ের সঙ্গে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
লক্ষণশ্রী ইউনিয়নে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বৈঠকের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার তারিখ নির্ধারণ করে জানানো হবে। কাঠইর ইউনিয়নে মঙ্গলবার বাছাই শুরু হয়নি। অন্যদিকে সুরমা ইউনিয়নে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও চিঠিপত্র না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট সদস্য সচিব।
সুরমা ইউনিয়নের সৈয়দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সদস্য সচিব সামসুল আলম রাসেল বলেন, তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও প্রতিযোগিতা পরিচালনার বিষয়ে কোনো চিঠি বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। অনেক শিক্ষক ও অভিভাবক ভেন্যুতে এলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্দেশনা না থাকায় তাঁরা সমস্যায় পড়েন। উপজেলা শিক্ষা অফিস, ক্রীড়া কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও সন্তোষজনক উত্তর পাননি বলে জানান তিনি।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের চরমহল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সজল কান্তি দাস জানান, শান্তিগঞ্জ মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মঙ্গলবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চার-পাঁচটি বিদ্যালয় এতে অংশ নিয়েছে। প্রথম দিনে সব ইভেন্টের খেলা শেষ না হওয়ায় বুধবার বিভিন্ন ইভেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এখন পর্যন্ত নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস প্রতিযোগিতায় ১৮ হাজার ৪৫০ জন খেলোয়াড় নিবন্ধন করেছে। জেলার ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জেলা ক্রীড়া অফিস জানায়, একটি ইউনিয়নের দল গঠনের জন্য ১৭৬ জন খেলোয়াড় প্রয়োজন। তবে সব ইউনিয়নে সমানসংখ্যক খেলোয়াড় নিবন্ধিত না হওয়ায় সব ইভেন্টে দল গঠন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মো. সোহাগ মিয়া জানান, প্রথম দিনে জেলার ৩০ থেকে ৪০টি ইউনিয়নে বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ছাতক, দোয়ারাবাজার ও জগন্নাথপুর উপজেলাতেও কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে সব ইউনিয়নে একই দিনে বাছাই সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের সদস্য সচিবদের নির্দেশনা না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা দুই যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা অসুস্থ থাকায় সমন্বয়ে কিছুটা ঘাটতি হয়েছে। সদরে সমন্বয়ের সমস্যা দেখা দিলেও তা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
সোহাগ মিয়া আরও জানান, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে একযোগে কার্যক্রম শুরুর বার্তা দেওয়া হলেও নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বাছাই ও দল গঠনের সময় রয়েছে। ফলে যেসব ইউনিয়নে মঙ্গলবার কার্যক্রম শুরু হয়নি, সেখানেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তিনি বলেন, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে দল গঠন করা হবে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক খেলোয়াড় থাকলে ১০টি ইভেন্টেই বাছাই করা হবে। তবে নিবন্ধিত খেলোয়াড়ের সংখ্যার ভিন্নতার কারণে সব ইউনিয়নে একইভাবে দল গঠন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া অধিদপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬–২০২৭ (সিজন–২)’-এর মূল লক্ষ্য ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের সুপ্ত ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ, খেলোয়াড় বাছাই এবং তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা।
কর্মসূচির আওতায় ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা ও অঞ্চল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই করে পর্যায়ক্রমে উপজেলা, জেলা, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিজয়ীদের সনদপত্র, মেডেল ও ট্রফি দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ে দল গঠন চলবে। ৫ নভেম্বর থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও শিক্ষা থানা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর জানুয়ারিতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষণ এবং দল গঠন শেষে ২৬ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও দল গঠনের জন্য ১৫ থেকে ২০ মার্চ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় পর্যায়ে বাছাই করা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের মে থেকে জুন মাসে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনার এমন উদ্যোগের শুরুতেই সুনামগঞ্জ সদরের একাধিক ইউনিয়নে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক যোগাযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাছাই ও দল গঠনের কাজ শেষ করা গেলে প্রাথমিক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে বলে আশা করছে জেলা ক্রীড়া অফিস।
