গানে গানে অমর দুর্বিন শাহ, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও অধরা
সুফিবাদ, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক দর্শনে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা লোকসংগীত
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ২২:৩১
দুর্বিন শাহ।
বাংলা লোকসংগীত ও মরমি সাহিত্যের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক নাম বাউল কবি ফকির দুর্বিন শাহ। সুফিবাদ, মরমি দর্শন, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক সাধনার অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলার লোকসংগীতের ভান্ডার। তাঁর রচিত অসংখ্য গান আজও মানুষের হৃদয়ে দোলা দেয়। তবে বাংলা লোকসংগীতে অসামান্য অবদান রাখলেও এখনো বড় কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি এই মরমি সাধক।
২ নভেম্বর তাঁর জন্মদিন। ১৯২১ সালের এই দিনে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর প্রকৃত নাম দুর্বিন শাহ। পরবর্তী সময়ে ফকির দুর্বিন শাহ নামেই পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত তারামনি টিলা এখন ‘দুর্বিন টিলা’ নামে পরিচিত।
দুর্বিন শাহের বাবা সফাত আলী শাহ ছিলেন সুফি সাধক। মা হাসিনা বানুও ছিলেন ধর্মপ্রাণ পীরানী। এমন আধ্যাত্মিক পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। পড়াশোনা করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। সুরমা নদী পার হয়ে বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশি দূর এগোতে না পারলেও সংগীত ও মরমি দর্শনে অর্জন করেছিলেন গভীর জ্ঞান।
শৈশব থেকেই গান লেখা ও সুর করার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। কৈশোরে গ্রামের আখড়া ও গানের আসরে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পরিচিতি বাড়তে থাকে। ১৯৪৬ সালে সুরফা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
দুর্বিন শাহের অধিকাংশ গানে সুফিবাদ ও মরমিবাদের গভীর প্রভাব রয়েছে। তবে তাঁর সংগীতের বিষয়বৈচিত্র্য ছিল বিস্তৃত। মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, সামাজিক বাস্তবতা, গ্রামীণ জীবন, মানবিক সম্পর্ক ও দেশপ্রেমও উঠে এসেছে তাঁর গানে। বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, হামদ-নাত, মারফতি, পির-মুর্শিদ স্মরণ, ভক্তিগীতি, দেহতত্ত্ব, সুফিতত্ত্বসহ নানা ধারায় তিনি অসংখ্য পদ রচনা করেছেন।
তাঁর গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ-সরল ভাষায় গভীর জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের প্রকাশ। মানুষের অন্তর্জগৎ, আত্মার অনুসন্ধান, মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা এবং স্রষ্টার সন্ধান তাঁর গানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রামবাংলার মানুষের মুখের ভাষাকে অবলম্বন করে তিনি মরমি সাহিত্যে তৈরি করেছেন নিজস্ব স্বর ও স্বতন্ত্র অবস্থান।
১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড সফর করেন দুর্বিন শাহ। এ সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন আরেক কিংবদন্তি বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম। ইংল্যান্ডে তাঁর গানের কথা, সুর ও দর্শনে মুগ্ধ হন প্রবাসী বাঙালি ও সংগীতপ্রেমীরা। তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ও সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
১৯৭৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৫৭ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মরমি সাধক। তাঁর শারীরিক প্রয়াণ ঘটলেও গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে।
ছাতকের নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলা থেকে উঠে আসা দুর্বিন শাহ শুধু সুনামগঞ্জের নয়, বাংলা লোকসংগীত ও মরমি সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। অথচ তাঁর অবদান ও সৃষ্টিকর্মের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এখনো অধরা। তাঁর গান সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও দর্শন তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
জন্মদিনে এই মরমি সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, প্রকৃত শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকেন। দুর্বিন শাহও তাঁর গান, দর্শন ও সাধনার উত্তরাধিকার নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেঁচে থাকবেন।