https://www.emjanews.com/

6878

sylhet

প্রকাশিত

০৪ জুলাই ২০২৫ ১৪:২৫

আপডেট

০৪ জুলাই ২০২৫ ১৫:৫৪

সিলেট

পাথরে সিলেটের লাভ না ক্ষতি?

২০ বছরে ভাগ্য উন্নয়ন হয়নি শ্রমিকের, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনেছেন প্রভাবশালীরা

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৫ ১৪:২৫

আগষ্টের পর ভোলাগঞ্জ রেলওয়ে বাঙ্কারের চিত্র । ছবি: ইমজা নিউজ

বহু বছর থেকে সিলেটের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি নদীতে পাথর উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করেন অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। তবে যন্ত্র ব্যবহার করে পাথর উত্তোলনের পর থেকে বদলে যেতে থাকে হিসাব। সীমান্তবর্তী বেশিরভাগ পাহাড়ি নদী বালু ও পাথর কোয়ারি হিসেবে লিজ দিতে শুরু করে সরকার। শুরু হয় নির্বিচারে নদীর পাড়, চা বাগান, কৃষিজমি, টিলা কেটে পাথর উত্তোলন। কাঁচা টাকার খেলায় সিলেটে গড়ে ওঠে পাথর ব্যবসার শক্তিশালী সিন্ডিকেট। পাথর উত্তোলন, ভাঙা, লোড আনলোড ও পরিবহণ মিলিয়ে এই বাণিজ্যের ওপরই এখন অনেকের রুটিরুজি নির্ভরশীল। সরকারও লীজ দিয়ে পায় বেশ বড় অংকের রাজস্ব।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেটে পাথর কোয়ারি লিজ দিয়ে সরকার যে  রাজস্ব পায়, তার ছয়গুণ বেশি ক্ষতি হয় পরিবেশ ও প্রতিবেশের। মাঝপথে সব ধ্বংস করে লাভবান হয় একটি গোষ্ঠি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ব্যবহৃত পাথরের মাত্র ৬ শতাংশ পাওয়া যায় এসব কোয়ারি থেকে। আর এই পাথর আহরনে প্রভাবশালীরা শ্রমিকের বদলে ব্যবহার শুরু করে যন্ত্রদানব “বোমা মেশিন”। বোমা মেশিনের তৈরী কার গর্তে পাথর তুলতে গিয়ে অনেক শ্রমিক গর্তে পড়েই মারা যান। অন্যদিকে প্রভাবশালীরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনেছেন।শ্রমিক এখনো শ্রমিকই রয়ে গেছে।প্রতি বছরই সনাতন পদ্ধতিতে পাথর তোলার ইজারা দেয়া হয় কিন্তু ইজারাদাররা কখনোই সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করেনি। “বোমা মেশিনের মতো যন্ত্র দানব ব্যবহার ঠেকাতেও ব্যর্থ হন স্থানীয় প্রশাসন কিন্ত ইজারা নীতিমালা ভঙ্গের কারনে কখনো কোন ইজারা বাতিল করতে দেখা যায়নি।


বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের সবগুলো পাথর কোয়ারি মিলে ৩৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও কেবলমাত্র কোম্পানিগঞ্জের শারফিন টিলাকে পাথর কোয়ারি ঘোষণার ফলে ৫ বছরে পরিবেশ ও সড়কের ভাঙচুর মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে অন্তত আড়াইশ কোটি টাকা।
এমন বাস্তবতায় প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষায় সিলেটে আর কোন পাথর কোয়ারি লিজ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। +-

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশের সব পাথর কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করে। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি এ স্থগিতাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় উদ্বেগ প্রকাশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ এপ্রিল  বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথর, সিলিকা বালু, নুড়িপাথর, সাদামাটি কোয়ারি মূহের ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত সভায় পরিবেশগত দিক বিবেচনায় দেশের ৫১টি পাথর কোয়ারির মধ্যে ১৭টির ইজারা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে  নৈসর্গিক সৌন্দর্য রক্ষার স্বার্থে সিলেট জেলার ভোলাগঞ্জ, উৎমাছড়া, রতনপুর, বিছানাকান্দি ও লোভাছড়া পাথর মহালে ইজারা প্রদান কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়। এছাড়া  প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত জাফলং পাথর কোয়ারি ইজারা দেয়া যাবে না বলেও সিদ্ধান্ত হয়। সরকারের এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে শুধুমাত্র ইজারা না দেয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছে স্থানায় প্রশাসন কিন্তু গত ১১ মাস স্বরনকালের ভয়াবহ লুটপাট চলেছে এসব পাথর কোয়ারীতে। যা ঠেকাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের। দেরিতে হলেও সম্প্রতি জাফলং পরিদর্শন করেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান। পাথর ব্যবসায়িদের বাধার মুখে  সাদাপাথর পরিদর্শন না করেই ঢাকা ফিরে যান তিনি। তবে কোয়ারি না খুলে দেওয়ার ব্যপারে এখন পর্যন্ত দৃঢ়তা ধরে রেখেছেন। সেই সাথে অবৈধ পাথর ভাঙ্গার মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যৌথ অভিযান অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন।
সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে পরিবেশে আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা বলেন, পরিবেশ ধ্বংস করে পাথর উত্তোলনে যে আমাদের আসলে কোনো লাভ নেই, বরং পরিবেশ প্রতিবেশে ধারাবাহিক ক্ষতি হচ্ছে এই বিষয়টি মানুষজনের বুঝতে হবে। পরিবেশে ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে অবৈধভাবে যে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে তাতে লাভবান হচ্ছেন কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষমাত্র। পাথর শ্রমিকরা কিন্তু দিনের পর দিন একই রকম অবস্থায় থাকছেন। নিরাপত্তার অভাবে পাথর তুলতে গিয়ে প্রতিবছর অপঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। 


পাথর রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্সের মত অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান।

অন্যদিকে কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে পাথর শ্রমিক-ব্যবসায়ি ও পরিবহণ শ্রমিক-মালিক পক্ষ জোরদার আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। পাথর উত্তোলনের সুযোগ না দেওয়া হলে সর্বাত্মক পরিবহণ ধর্মঘটেরও ডাক দিয়েছেন তারা। তাদের সাথে একাত্মতা জানিয়েছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও।