https://www.emjanews.com/

7926

sylhet

প্রকাশিত

০১ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৮

আপডেট

০১ আগস্ট ২০২৫ ১৮:৫২

সিলেট

পানজুম ধ্বংস

গাছ নয়, যেন স্বপ্ন কেটেছে দুর্বৃত্তরা

মেয়ের আকুতি ছুঁয়ে গেল হাজারো হৃদয়

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ ১৪:১৮

বাবার কান্না দেখে মেয়ে রিমায়া খংলা ফেসবুক স্ট্যাটাস

‘আমার বাবা, যিনি সারা জীবন এই গাছগুলোর মতোই ধৈর্য ধরে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন, সেই মানুষটাকে আজ একদম ভেঙে পড়তে দেখছি। কলিজা ফেটে যায় বাবার চেহারাটা দেখলে। এখন আর কিছু আবদার করতে মন চায় না, শুধু ভাবি, কী করলে বাবার কষ্টটা একটু কমবে।’

রিসন কংওয়াংয়ের মেয়ে রিমায়া খংলা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বাবার কান্না দেখে এভাবেই স্ট্যাটাস দেন। তার স্ট্যাটাস ইতোমধ্যেই মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। 
তিনি আরও লিখেন, তাদের পরিবারের প্রতিটি খরচ, ভাইবোনদের পড়াশোনা, খাবার, চিকিৎসা, সবই চলত এই জুমবাগান থেকে। এখন এক নিমিষেই সব শেষ। পরবর্তী পাঁচ বছর কিভাবে চলবে, এই অনিশ্চয়তায় পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে তীব্র আতঙ্ক।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের প্রতাপপুর পুঞ্জিতে দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলায় ধ্বংস হয়েছে খাসিয়া সম্প্রদায়ের দুটি পরিবারে লালিত স্বপ্ন, পানসুপারির জুমবাগান। রাতের আঁধারে কেটে ফেলা হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি লতানো পান গাছ।


ক্ষতিগ্রস্ত লামাপুঞ্জির হেডম্যান রিসন কংওয়াং ও তার প্রতিবেশী গস্মিন ডিখার পরিবারের এখন চোখেমুখে শুধুই হতাশা ও অনিশ্চয়তা। এই জুমবাগানই ছিল তাদের একমাত্র জীবিকার উৎস। পানগাছের প্রতিটি পাতা যেন ছিল তাদের সন্তানের পড়াশোনা, ঘরের বাজার, অসুস্থতায় ওষুধের খরচ এবং ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণের অবলম্বন।

সোমবার  গভীর রাতে (২৯ জুলাই) দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে দুটি জুমবাগানে হামলা চালিয়ে কেটে ফেলে প্রায় দুই হাজার পান গাছ। এতে দুটি পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়। পান গাছ বড় করে তুলতে গড়ে লাগে ৪-৫ বছর সময়। ফলে আগামী কয়েক বছর তাদের হাতে কোনো আয় থাকবে না, যা একেবারে অস্তিত্বসংকটে ঠেলে দিয়েছে পরিবারগুলোকে।

এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় শুধু দুটি পরিবার নয়, পুরো খাসিয়া সম্প্রদায়ের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ ও শঙ্কা।


রিমায়া খংলা স্ট্যাটাসে হুবুহু তোলে ধরা হলো-’আমি রিমায়া খংলা ,রিশন কংওয়াং এর একজন ছোট মেয়ে ।

সম্প্রতি গত ২৯শে জুলাই ২০২৫ , মাঝরাতে কিছু দুর্বৃত্ত এবং দু্স্কৃতকারিরা আমাদের সেই একমাত্র পানবাগান থেকে প্রায় দুই হাজার এর বেশি পান গাছ কর্তন করেছে । আমাদের জীবিকা ও সংসার চলে একটি মাত্র জুমে (পান-সুপারি বাগানে) যেখানে আমার বাবা পান চাষ করছে। কিন্তু আজ অত্যন্ত দুঃখের ও লজ্জার সঙ্গে জানাতে বাধ্য হচ্ছি যে, সম্প্রতি কিছু দুর্বৃত্তরা আমাদের সেই একমাত্র পানবাগানটি থেকে পান গাছ গুলো কেটে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।

এই নিষ্ঠুর ঘটনার ফলে আমাদের পরিবারের উপর ভয়ানক আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। আমাদের পরিবারের সংসার খরচ , ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচ যে কিভাবে চলবে এই চিন্তা করতেও ভয় পাচ্ছি । বাবার চেহারাটা দেখলে কলিজা টা ফেটে যায়, এই মানুষটি আমাদের বড় করতে তার জীবনে কতটা কষ্ট করেছে, এখন আর বাবার কাছে কিছু আবদার করতে মন চায় না, শুধু ভাবি কি করলে বাবার কষ্ট কমবে..!   একটা নতুন করে পান বাগানে পরিপূর্ণভাবে পান গাছ গড়তে আনুমানিক প্রায় ৫ বছর সময় লেগে যায় ।

এই সময়ের মধ্যে আমাদের সংসার যাবতীয় খরচ, ভাইবোনদের পড়াশোনার খরচ আরও কত কিছু রয়েছে তা কিভাবে চলবে? আমরা সবাই ক্ষুব্ধ এবং ব‍্যথিত। সব থেকে বড় কষ্ট কি জানেন যখন বাবা সবার সামনে কেঁদে ফেলে । যেখানে আমার পরিবার সম্পূর্ণ নির্ভর করে একটি পান জুমের উপর, সেখানে সেটি ধ্বংস করে দেওয়া মানে আমাদের বাঁচার শেষ ভরসাটুকু কেড়ে নেওয়া। মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর হতে পারে? 

ছোটবেলা থেকেই দেখছি, আমার বাবা কত কষ্ট করে, ঘেমে-নেয়ে পান-সুপারির বাগানে কাজ করছেন—শুধু আমাদের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে, আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে, একটা সম্মানের জীবন দিতে।
কিন্তু আজ কলম ধরতে গিয়েও হাত কাঁপছে।

২৯শে জুলাই, ২০২৫- এই দিনটা আমাদের জীবনে চিরকাল একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে। এই পানজুমই ছিল আমাদের সংসারের চালিকাশক্তি। এখান থেকেই চলতো বাজার খরচ, ওষুধপত্র, ভাইবোনদের পড়াশোনার ফি। এখন কিছুই নেই,এক নিমিষে সব শেষ।

আমার বাবা, যিনি সারা জীবন এই গাছগুলোর মতোই ধৈর্য ধরে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন, সেই মানুষটাকে আজ একদম ভেঙে পড়তে দেখছি।
পান গাছ বড় করে তোলার জন্য কমপক্ষে ৫ বছর সময় লাগে।

তার মানে পরবর্তী পাঁচটা বছর আমরা শূন্য হাতে বাঁচার চেষ্টা করবো। কিন্তু একটা পরিবার খালি শূন্যতায় কীভাবে টিকে থাকবে? বই-খাতা, বাজার, বিদ্যুৎ, ওষুধ—সবই এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন কৃষকের গাছ মানেই শুধু পাতা বা ফল নয়, সেটাই তার স্বপ্ন, তার ভবিষ্যৎ, তার জীবন। সেই স্বপ্নটা রাতারাতি কেটে ফেলা হয়েছে।

এই নির্মম ঘটনায় আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি- এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তি প্রদান করা হোক এবং আমাদের এই ক্ষতির জন্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হোক।
আমাদের প্রতি এই অন্যায় যেন উপেক্ষিত না হয়। আমরা আশা করি, প্রশাসন মানবিকতার দৃষ্টিতে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।‘